(ধারাবাহিক উপন্যাস) পথে পথে -১২

লোকটার ব্যাপারে ফারিয়ার ধারণা অল্প সময়ের মধ্যে মিথ্যা প্রমানিত হয়। কি এক পবিত্র মানুষ তিনি! এ দুনিয়ায় এমন মানুষ আশা করা যায়না। খাবার চেয়েছিলেন ভদ্রলোক। ম্যানেজার ভেবেছিল এতো রাতে মানুষটা নিশ্চই ……. চাচ্ছে। ম্যানেজারকে আচ্ছামতো বেশি কথা বলে তারপর ক্ষ্যান্ত হন। ফারিয়ার কাছে জানতে চায় তাদের বাড়ি কতোদূর, কে কে আছে, কেন এই পথে আসলো? ফারিয়া কিছু বলতে পারেনা। শুধু বাবার কথা ভেবে গুমড়ে গুমড়ে কাঁদে। অনেক সময় দু’জন চুপ করে থাকে। নিরবতা ভাঙ্গে পবিত্র মানুষটি। প্রশ্ন করে, ‘ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে অনেক দুঃখ তোমার বুকের ভেতর। আমাকে বলবে তোমার দুঃখের কথা?’
ফারিয়া আরও জোরে ঢুকরে কেঁদে ওঠে। এভাবে করে ওদের অসহায় বাবা মেয়ের কষ্টের কথা কেউ কোনদিন জানতে চায়নি। ফারিয়া একে একে সব ঘটনা, ওর বাবার অসুখ, শ্যামল চক্রবর্তীর প্রতারনার কথা, সবকিছু বলে যায়। লোকটা আগ্রহ, সমবেদনা নিয়েই তার কথা শোনে। ওর কথা শেষ হলে ওকে সন্ত্বনা দেয়, ‘ প্রভূ তোমাকে হেফাজত করেছেন। এখন অনেক রাত, এতো রাতে রাস্তায় বের হওয়া ঠিক নয়। কাল সাকালে ইনশাআল্লাহ তোমাকে তোমার বাবার কাছে পৌছে দেব। তুমি খাটের উপর চুপচাপ ঘুমাতে পার।’
ফারিয়া বিছানায় গিয়ে শোয়, তবু একটা ভাবনা, ভয় মন থেকে যায়না। লোকটা একটা মানুষ, একটা পুরুষ। সে আবার যুবক। একটা যুবতী মেয়েকে একরুমে নিরব রাতে পেয়ে তাকে ভোগ না করে কিভাবে সে শান্ত থাকবে! হতে পারে ফারিয়াকে মুগ্ধ করার এ তার একটা কৌশল। একটু পরে লাইট বন্ধ করে ফারিয়ার ঘাড়ে চড়বে। ফারিয়া ভয়ে ভয়ে চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকে।
লাইট বন্ধ করে লোকটা ডিম লাইট জ্বালায়। ফারিয়ার বুকের ভেতর ধুক করে ওঠে। যুবক ব্যাগ থেকে কি যেন একটা বের করে। সেটা ফ্লোরে বিছায় তারপর বাথরুমে যায়। বাথরুম থেকে এসে লোকটা নামাযে দাড়ায়। তারপর অনেক সময় ধরে নামাজ পড়ে। ফারিয়া শুয়ে শুয়ে তার কর্মকান্ড দেখে। নামায শেষ হলে আস্তে আস্তে খোদার নাম জপ করতে শুরু করে। সেও চলে অনেক সময়। তারপর….! উফ্, অসহ্য। কি একটা মানুষ সর্ম্পকে খারাপ ধারণা করেছিল ফারিয়া? লোকটাকে দেখেও বোঝা যায়না সে এতোটা পবিত্র। খোদার কাছে ঢুকরে ঢুকরে কাঁদে। অবিশ্রান্ত কান্না। ফারিয়ার মনে হয় এ খোদার এক পবিত্র বান্দা। প্রিয়, বড় মাহ্বুব এক বান্দা। এ মানুষ গুলো তার মালিক সবকিছু অবলোকন করছেন এই বিশ্বাসে পৃথিবীর সব পাপ কাজ থেকে বিরত থাকে। একটা অসাধারন ক্ষমতা থাকে তাদের। প্রভূর দেওয়া। ফারিয়া কখন যে ঘুমিয়ে যায় মনে থাকেনা। সুবহে সাদিকের সময় মৃদূ কন্ঠের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে।
‘ ফারিয়া, বোন আমার। ওঠ।’
ফারিয়া ওঠে। ভদ্রলোক মাথা নিচু করে বলেন, ‘ আমি মসজিদে যাচ্ছি, তুমি দরজা বন্ধ করে নামায পড়ে নাও।’
ফারিয়া উঠে সত্যিই নামায পড়ে। বেশ সকাল হওয়ার পর লোকটা আসে। ফারিয়ার সামনে আসতেই বলে, ‘ ভাইয়া আপনার নামটা কিন্তু বলেননি।’
‘ আমার নাম মোকলেস।’
‘ আপনার মতো মানুষ আমি পৃথিবীতে দেখিনি। জানিনা আপনার মতো মানুষ পৃথিবীতে আছে কিনা।’
মোকলেস মানুষটা হাসে। ‘ কি যে বলো তুমি। পৃথিবী আমার চাইতে হাজার বেশি ভাল মানুষ নিয়ে চলছে। আমি তো ভাল মানুষ না। চলো তোমাকে তোমার বাবার কাছে পৌছে দিয়ে আসি।’
‘ চলুন।’
বাড়ি গিয়ে দেখে ওর বাবা কেমন কষ্ট নিয়ে বিছানায় পড়ে আছে। ফারিয়া ডাক দিতেই বৃদ্ধ অসহায় মানুষটি চোখ মেলে তাকায়। তার দৃষ্টিতে ঘৃনা। ক্ষীন কন্ঠে বলেন,‘ রাতে কোথায় ছিলে? তোর সাথের এ মানুষটি কে!’
‘ আমি মোকলেস, আপনার এক সন্তান।’ সামনে গিয়ে কথা বলে মোকলেস।
‘ তা আমার মেয়ে রাতে কোথায় ছিল?’
‘ চাচাজান আল্লাহপাকের শুকরিয়া সে ভাল যায়গায় ছিল। ও যে চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েছিল তাতে সুস্থ জীবনে ফিরে আসা ওর আর কোনকালে সম্ভব ছিল কিনা সন্দেহ। খোদা ওকে হেফাজত করেছেন।’
তারপর একে একে সবকিছু অসহায় মানুষটাকে জানায় মোকলেস। ফারিয়ার বাবা আসমানের দিকে তাকিয়ে ঢুকরে কেঁদে ওঠেন। ‘ হায় প্রভূ তুমি আমাদের রক্ষা করো।’
মোকলেস বলে, ‘ আমার পরিচিত একটা যায়গা আছে যেখানে আপনাদের মতো অনেক অসহায় মানুষ জীবন যাপন করছে। আপনারা চাইলে সেখানে যেতে পারেন।’
‘ এতো আমাদের সৌভাগ্য বাবা।’
তারপর গাড়িতে করে মুসলিম মানব কল্যাণ ট্রাস্টে আসা। এখানে এসে শুনেছে, সবকিছু মোকলেস ভাইয়ের। ফারিয়া, ফারিয়ার বাবা দু’জনেই খুব অবাক হয়। এতো কিছু, সম্পদ, টাকা যার নিজের সে মানুষটা কতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করে। মনে হয় কিচ্ছু নেই তার। অসহায় মানুষের প্রতি তার কি দরদ।

VN:R_U [1.9.7_1111]
রেটিং করুন:
Rating: 2.0/5 (1 vote cast)
VN:F [1.9.7_1111]
Rating: 0 (from 0 votes)
(ধারাবাহিক উপন্যাস) পথে পথে -১২, 2.0 out of 5 based on 1 rating

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের, লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর। শব্দনীড় ব্লগ কোন লেখা ও মন্তব্যের অনুমোদন বা অননুমোদন করে না।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

৪ টি মন্তব্য (লেখকের ১টি) | ৩ জন মন্তব্যকারী

  1. মুরুব্বী : ১৪-০২-২০১১ | ২৩:০৬ |

    অনেক অনেক ধন্যবাদ।

  2. মোহাম্মদ অয়েজুল হক : ১৪-০২-২০১১ | ২৩:১৩ |

    আপনার জন্য দেখা পেলাম। Rose

  3. জ.ই মানিক : ১৫-০২-২০১১ | ০:১৪ |

    অনেক সুন্দর,প্রিয় জীবন।
    Rose Rose Rose
    শুভ কামনা নিরন্তর।

  4. ছায়েদা আলী : ২৩-০২-২০১১ | ৫:২৪ |

    হা…হা…….হা………..তুমি জীবন নাহ্ ! আশ্চর্য Smile
    আছো কেমন জীবন ? যখন আমার বিকেল গুলো অনেক একা কাটতো তোমার আর কাবুল ভাই এর উপন্যাস থাকতো আমার বিকেলের খোরাক হয়ে …..ভালো লাগছে অনেক Smile
    ভালো থাকো অনেক ………