মাহমুদুন্নবী এক কালজয়ী জাত শিল্পীর না পাওয়ার গল্প

407167_140892469361382_100003218886700_177027_1233847032_n
যদি বলা হয় পৃথিবীর বুকে কিংবা বিশ্ব সঙ্গীতে সব চাইতে সমৃদ্ধ কোন সঙ্গীত? তাহলে এক বাক্যে বলা চলে আমাদের বাংলা সঙ্গীত।বিশ্ব সঙ্গীত ইতিহাসের পর্যালোচনা ও গবেষণা করে দেখা যায় আমাদের বাংলা সঙ্গীতের মত এত ব্যাপ্তি পৃথিবীর কোন সঙ্গীতে কোনদিনও দেখা যায়নি, যাবেও না। একটি মাত্র ভাষা বাংলা। আর কত যে তার গানের বাহার, কত যে প্রকার সেটি বলে হয়তো শেষ করা সম্ভব নয় । আউল, বাউল, জারি, শারি, ভাটিয়ালী, মুর্শিদি, লালন, হাসন, বিচ্ছেদ, কবি,পালা, গাজীর গীত, ভাওয়াইয়া, পল্লী গীত,রবি, নজরুল, আধুনিক, চলচ্চিত্র সকল ক্ষেত্রে বাংলা গানের এত বাহারি রূপ দেখে বিশ্ব সঙ্গীত বোদ্ধারা এক বাক্যে বাংলা সঙ্গীত কে এই মর্মে প্রত্যয়ন করেছেন যে “ আসলেই সঙ্গীতের প্রতিটি শাখা প্রশাখায়, শিরায় উপ শিরায় বহমান আমাদের বাংলাদেশী সঙ্গীত”। কাল ( সময়) কে অতিক্রম করে আসা সেই সব সঙ্গীত আজও ধারণ, লালন, পালন করে আসছে আমাদের এই বাংলাদেশের সঙ্গীত শিল্পীরা। আজ কথা বলছি আমাদের দেশিয় আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গান নিয়ে। আমাদের আধুনিক গান গুলো যারা অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম কণ্ঠ শিল্পী প্রয়াত মাহমুদুন্নবী। আজ তাকে স্মরণ করে দুটো কথা বলতে চাই।

আমাদের দেশে মূলত ৭০ এর দশকে বাংলা ব্যান্ডের যে গন জোয়ার শুরু হয়েছিল তার অনেক আগ থেকেই আধুনিক গান তার নিজ স্বকীয়তায় আপন মহিমায় ভাস্বর ছিল। আর চলচ্চিত্রের গান তো ৭০ এর পরে আমাদের সঙ্গীত পরিবারে জাঁকিয়ে বসেছিল। আধুনিক আর চলচ্চিত্রের সেই সব কালজয়ী গানগুলো আজও আমাদের নস্টালজিক করে তোলে। সুরের ভেলায় ভেসে ভেসে আমরা হারিয়ে যাই কোন এক সময় অসীমের পানে। দূর আকাশের দূর নক্ষত্রের মত উদাস হয়ে একাকী কত যে নির্ঘুম রাত কাটে সেই খবর কেবা রাখে? যান্ত্রিক এই সভ্যতা আর অদম্য শক্তি প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে আমরা যখন হারিয়ে ফেলি নিজের স্বত্বাকে তখন মাঝে মাঝে ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে আমরা শ্রবণ করি কিছু সুখশ্রাব্য গান। গান ভালোবাসেন না এমন মানব মানবী হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতেও পারে। তবে আমাদের বাংলাদেশী সঙ্গীতে শিল্পী মাহমুদুন্নবির নাম টি শোনেন নি এমন লোক পাওয়া সত্যি বিরল। অসংখ্য আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে আজও তিনি বেঁচে আছেন আমাদের মনের মণিকোঠায়।

৮০ এর দশকে আমাদের দেশে সঙ্গীত শ্রবণের মাধ্যম বলতে ছিল বাংলাদেশ বেতার ও স্টুরিয়ো টেপ রেকর্ডার। সেই সেদিনের কোন এক অলস দুপুরে ইথারে ভেসে আসা গান গুলো যখন রেডিয়োর স্পিকারে বেজে উঠতো তখন আমি কান পেতে রইতাম তার বিহীন ইথারে ভেসে আসা সেই রেডিয়ো সেটের পানে। সেই সময় কিছু পরিচিত গান আজও মনের অজান্তে গেয়ে ফেলি।৯০এর দশকের কোন এক সময় একদিন শুনেছিলাম “ সুরের ভুবনে আমি আজও পথচারী, ক্ষমা করে দিও যদি না তোমায় মনের মত গান শুনাতে পারি”। গানটি শুনে এত বেশি ভালো লেগেছিল যে আমি সত্যি মুগ্ধ হয়ে শিল্পীর নাম টি খুঁজে ফিরছিলাম। এক সময় জানা গেল এটি বাংলাদেশী লিজেন্ড মাহমুদুন্নবী’র গান! একটা শিল্পীর কণ্ঠে কত দরদ আর কতটা আবেগ থাকলে এমন একটি গান গাওয়া সম্ভব? ৭০ এর দশকে গাজী মাজহারুল আনয়ার এর লেখা আর সত্য সাহার সুরে “সুরের ভুবনে” গানটি শুনলে সহজেই অনুমেয়। পরিষ্কার উচ্চারণ, আবেগ আর মেলোডি এই তিনের মিশেলে একজন শিল্পী যে জাত শিল্পীতে রূপান্তরিত হয়ে যান সেটি সুবল দাসের সুরে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখায় “ গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে বল কি হবে?”- গানটি শুনলে আরও স্পষ্ট অনুধাবন করা সম্ভব যে মাহমুদুন্নবী কতটা লিজেন্ড ছিলেন।

১৯৩৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বর্ধমান জেলার কেতু নামক এক অজ পাড়া গায় এই লিজেন্ড এর জন্ম। বাংলার এই মেলোডি কিং ছিলেন সহজ-সরল, মিষ্টভাষী এবং চরম অভিমানী এক মানুষ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কেবল গান ই লালন করতেন তার হৃদয়ে। তার উল্লেখযোগ্য গান গুলোর মধ্যে “ তুমি যে আমার কবিতা, আমারও বাঁশি রাগিণী”, “ তুমি কখন এসে দাড়িয়ে আছো আমার অজান্তে”, “ ও গো মোর মধুমিতা”, “ সালাম পৃথিবী তোমাকে সালাম দুনিয়া কে করেছো টাকার গোলাম”, “ আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছি” অন্যতম। মেলোডি কিং মাহমুদুন্নবি এই দেশের আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে যেই শুভ সূচনার উন্মেষ ঘটিয়েছিলেন সেই ধারাবাহিকতা আজ এই দেশের চলচ্চিত্রের গানে লক্ষ্য করা যায়না বললেই চলে। এই দেশের চলচ্চিত্রের গানের যেই বিশালতা ছিল ৯০ এর শেষ পর্যন্ত সেই সব গান গুলো আজ আর শুনতে পাইনা সত্যি।

মাহমুদুন্নবী আসলেই আমাদের সঙ্গীত আকাশের এক জ্বলন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র। নক্ষত্র যেমন আলোকিত করে বিশ্ব ভ্রমান্ড, আলোকিত করে চার পাশ, তেমনি মাহমুদুন্নবি ও তার সুরের আকাশকে আলোকিত করেছিলেন। সেই আলোকিত আভায় জন্ম হয়েছিল সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী,পঞ্চমের মত শিল্পীদের। কিছুদিন আগে আমার ফেস বুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম ঠিক এই ভাবে-
“ একজন কণ্ঠ শিল্পীর মনে ” আমি কিছু জানিনা এবং শিক্ষার্থী মনোভাব” এই দুটো জিনিস ভীষণ ভাবে জরুরী! ৭০ দশকে সত্য সাহার সুরে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় আমার প্রিয় শিল্পী প্রয়াত মাহামুদুন্নবি গেয়েছিলেন একটি গান- ” সুরের ভুবনে আমি আজও পথ চারী- ক্ষমা করে দিও যদি না তোমার মনের মত গান শুনাতে পারি” - অসম্ভব ভালো লাগা এই শিল্পিকে এক সময় গানের জগত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শিল্পীদের জীবনে আর ১০ জনের মত অভিমান থাকে। আর এই গুলো না থাকলে বোধ হয় শিল্পী জীবন অপূর্ণ থেকে যায়! রাজ প্রাসাদের মত বিরাট ভরাট কণ্ঠের অধিকারী শিল্পী মাহামুদুন্নবি কে সত্য সাহার সুরে গাজী মাজহারুল আনোয়ার এর লেখায় ” আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছি” এই গানটির জন্য একুশে পদক ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে সেই পুরস্কার দেওয়া হয়নি!!! আর এই অভিমানে তিনি বাকি জীবন গান থেকে নির্বাসনে ছিলেন!! ওগো মোর মধুমিতা, গানের খাতায় স্বরলিপি, বহু গান আমি শুনেছি, তুমি কখন এসে দাড়িয়ে আছো আমার অজান্তে- আমার গানের ও প্রান্তে তুমি দাড়িয়ে আছো গো, তুমি আমার কাছে আছো , খোলা জানালার পাশে একা বসে আছি- এই সব মেলোডিয়াস গানের কণ্ঠ শিল্পী মাহামুদুন্নবি কে যেন সেই একুশে পদক টি অন্তত মরণোত্তর ভাবেও দেওয়া হয়! শিল্পী সামিনা, ফাহমিদা, পঞ্চম তাদের যে কোন একজনের হাতে সামান্য পুরস্কার টি তুলে দিলে খানিক ভারমুক্ত হয় দেশের সঙ্গীত ভুবন!”

স্ট্যাটাস টি দেবার পরে পঞ্চম ভাই ফোনে বলেছিলেন বাবাকে তো আর এই প্রজন্মের কেউ চিনেনা! আমি ভাবছিলাম পঞ্চম ভাই কি ঠিক বলছেন? মাহমুদুন্নবি কে আমাদের প্রজন্ম চিনেনা এটি কি করে সম্ভব? আর সেই বোধ থেকে এই লেখাটির জন্ম। গানের মানুষ হিসাবে একটি কষ্ট আজও লালন করি আমি আমার অন্তরে। কেন তাকে ২১ শে পদক দেওয়া হবে এই ঘোষণা দিয়ে, লিস্ট করেও দেওয়া হলনা? আমি বিশ্বাস করি শুধু একুশে পদক নয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদকে তাকে ভূষিত করা যায়। গান কে যারা লালন করেন, গানের সঙ্গে নিত্য বসত যাদের তাদের কাছে মাহমুদুন্নবীর সার্টিফিকেট নিতে হয়না। কিন্তু আজ যখন সফটওয়্যারে গান গেয়েও একাধিক এওয়ার্ড প্রাপ্ত হন তখন কষ্ট লাগে উনাকে কেন পদক টি দেওয়া হলনা? আমাদের বাংলাদেশের সঙ্গীতে লিজেন্ড মাহমুদুন্নবীর যেই অবদান, তার প্রতি আমাদের যেই ঋণ, তার প্রতি আমাদের যে দায় সেই দায় কি আমরা আজও বহন করে যাব? আজ ৩ যুগ পরেও অনেক কে পুরস্কৃত করা হয়। মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে কেন “ আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছি” এই গানটির জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেও তাকে সেটি দেওয়া হয়নি? আসছে ভাষার মাস একুশে। এবার ও অনেকে পুরস্কৃত হবেন নানা ক্যাটাগরিতে। কিন্তু মাহমুদুন্নবী কেন সেই একুশে পদক টি পেলেন না আজও জানা যায়নি। রাষ্ট্র কি পারেনা সেই দায় থেকে মুক্তি পেতে?

VN:R_U [1.9.7_1111]
রেটিং করুন:
Rating: 5.0/5 (1 vote cast)
VN:R_U [1.9.7_1111]
Rating: +1 (from 1 vote)
মাহমুদুন্নবী এক কালজয়ী জাত শিল্পীর না পাওয়ার গল্প, 5.0 out of 5 based on 1 rating

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের, লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর। শব্দনীড় ব্লগ কোন লেখা ও মন্তব্যের অনুমোদন বা অননুমোদন করে না।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

৩ টি মন্তব্য (লেখকের ০টি) | ৩ জন মন্তব্যকারী

  1. সাইক্লোন : ২৯-০১-২০১২ | ১৩:২০ |

    অসংখ্য ধন্যবাদ উজ্জল ভাই, এই পোষ্টের জন্য।
    সরাসরি প্রিয়তে রাখলাম।


    মাহামুদুন্নবির গাওয়া একটি প্রিয় গান, আবিদের কণ্ঠে। দুজনেই আজ আমাদের মাঝে নেই। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।

  2. ডা. দাউদ : ২৯-০১-২০১২ | ১৯:১৫ |

    সত্যি অসাধারন Yes Yes
    ধন্যবাদ আপনাকে।

  3. সাহাদাত উদরাজী : ৩০-০১-২০১২ | ৩:৫৫ |

    আমি আপনার পোষ্টের ভক্ত।
    আপনার পোষ্টে অনেক তথ্য থাকে।

    শুভেচ্ছা।