অন্তর কঠিন হওয়ার কারণ ও প্রতিকার- শেষ পর্ব

আগের পর্ব …
অন্তর কঠিন হওয়ার প্রতিকার :
(১) আল্লাহ তা‘আলাকে চেনা : অন্তর কঠিন হওয়া থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রথম ও প্রধান উপায় হ’ল আল্লাহর রহমত, ক্ষমা, শাস্তি ও মর্যাদা জানার মাধ্যমে অন্তর নরম করার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের জন্য ছুটে আসা। আল্লাহ বলেন, ‘পাপ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও সামর্থ্যবান। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তাঁরই দিকে হবে প্রত্যাবর্তন’ {গাফির ৪০/ ৩}।

(২) কুরআন তিলাওয়াত করা : কুরআন তিলাওয়াত করা ও এর অর্থ বুঝে আমল করার মাধ্যমে অন্তর নরম হয়। আল্লাহ বলেন, ‘(বিনয়ী হ’ল তারা) যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হ’লে ভীত হয় এবং যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে’ {হজ্জ্ব ২২/৩৫}। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহ.) কুরআন দ্বারা কঠিন অন্তরের কিভাবে চিকিৎসা করতে হবে তা অতি সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন এভাবে- ‘এটির দু’টি পথ রয়েছে- এক- আপনার অন্তরকে দুনিয়া থেকে স্থানান্তর করে আখেরাতের দেশে নিয়ে যাবেন। দুই- অতঃপর কুরআনের অর্থ বুঝবেন এবং কেন নাযিল হয়েছে সেটা বুঝার চেষ্টা করবেন এবং প্রত্যেক আয়াত হ’তে আপনার জন্য প্রয়োজনীয় অংশ গ্রহণ করে তা আপনার অন্তরের ব্যধির উপর প্রয়োগ করবেন। তা যদি আপনার অসুস্থ অন্তরের উপর প্রয়োগ করেন, তাহ’লে আল্লাহর ইচ্ছায় আরোগ্য লাভ করবেন’।*৬*

(৩) অন্তরকে পরকালীন চেতনায় উজ্জীবিত করা : অন্তরকে বুঝাতে হবে যে, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের পরে রয়েছে স্থায়ী, অনাদি, অনন্ত আখিরাতের জীবন। সে জীবনের তুলনায় এ নশ্বর জীবন নিতান্তই তুচ্ছ ও নগণ্য। রাসূল (ছা.) বলেন,

‘আল্লাহর কসম! আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ হ’ল যেমন তোমাদের কেউ মহাসাগরের মধ্যে নিজের একটি অঙ্গুলি ডুবিয়ে দেয়, এরপর সে লক্ষ্য করে দেখুক তা কি (পরিমাণ পানি) নিয়ে আসল’।*৭*

জাবের (রা.) হ’তে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (ছা.) একটি কানকাটা মৃত বকরীর বাচ্চার নিকট দিয়ে অতিক্রমকালে বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে একে এক দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করতে পসন্দ করবে’? ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা তো একে কোন কিছুর বিনিময়েই ক্রয় করতে পসন্দ করব না। তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! এটা তোমাদের কাছে যতটুকু নিকৃষ্ট, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়েও অধিক নিকৃষ্ট’।*৮*

(৪) মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী অবস্থার কথা চিন্তা করা : দুনিয়ার জীবনের পর সবাইকে মরতে হবে এবং দুনিয়ার জীবনের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এ চিন্তা ও বিশ্বাসই মানুষর অন্তর নরম করতে পারে। মরণের পর কবরে যেতে হবে, মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, হাশরের ময়দানে আমলনামা নিয়ে উঠতে হবে, আমল ভাল হ’লে জান্নাত, না হয় জাহান্নাম। একথা চিন্তা ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই অন্তর নরম হয়। পক্ষান্তরে সে যদি পরকালের জবাবদিহিতার কথা ভুলে যায়, তাহ’লে তার অন্তর দুনিয়ার মায়ায় আচ্ছাদিত হয়ে কঠিন হয়ে যায়।

(৫) কবর যিয়ারত করা ও তাদের অবস্থা চিন্তা করা : কোন মানুষ যদি কবরের কাছে গিয়ে এই চিন্তা করে যে, এই কবরে যে আছে সে একদিন দুনিয়াতে ছিল, আমার মত খাওয়া-দাওয়া করত, চলাফেরা করত। আজকে সে কবরে চলে গেছে, তার দেহ মাটি হয়ে গেছে, তার সম্পদ তার ছেলে-মেয়েরা ভাগ করে নিয়েছে। আমাকেও একদিন তার মত কবরে যেতে হবে। তাহ’লে অন্তর নরম হবে। রাসূল (ছা.) বলেছেন, ‘আমি প্রথমে তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা এটা অন্তরকে নরম করে’।*৯*

আবু হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেছিলেন। অতঃপর তিনি কেঁদেছেন এবং আশেপাশে যারা ছিল তাদের কাঁদিয়েছেন। অতঃপর বললেন, আমি আল্লাহর কাছে আমার মায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়ার অনুমতি চেয়েছি, কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া হয়নি। আমি আল্লাহর কাছে তাঁর কবর জিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছি। অতঃপর আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা এটা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়’।*১০*

(৬) আল্লাহর নির্দশনাবলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা : আল্লাহ কুরআনে আযাব-গযবের অনেক আয়াত নাযিল করেছেন। বিভিন্ন জাতি অবাধ্য হওয়ার কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়ার কাহিনী বর্ণনা করেছেন। চিন্তাশীল মানুষ যদি এগুলি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন তাহ’লে তার অন্তর নরম হবে। আল্লাহ বলেন,

‘আল্লাহ উত্তমবাণী তথা কিতাব নাযিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পুনঃ পুনঃ পঠিত। এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার উপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথনির্দেশের মাধ্যম। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন তার কোন পথ প্রদর্শক নেই’ {যুমার ৩৯/২৩}।

(৭) বেশী বেশী আল্লাহর যিকর করা ও গুনাহ মাফ চাওয়া : অন্তরের কঠিনতা যিকর ব্যতীত দূর হয় না। প্রত্যেকের উচিৎ অন্তরের কঠিনতা দূর করার জন্য আল্লাহর যিকর করা। একজন লোক হাসান (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবু সাঈদ! আপনার নিকট অন্তর কঠিন হওয়ার অভিযোগ করছি, তিনি বললেন, তুমি (অন্তরের কঠিনতা থেকে বাঁচতে) যিকর করবে। ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘দু’টি জিনিস অন্তরকে বন্ধ করে দেয়- অলসতা ও গুনাহ, এবং দুটি জিনিস এটাকে শূন্যতা করে- ক্ষমাপ্রার্থনা ও যিকির।

(৮) সৎ লোকদের সঙ্গী হওয়া ও তাদের থেকে উপদেশ গ্রহণ করা : সৎ লোকদের সাথে থাকা, তাদের সাথে চলাফেরা করা ও তাদের থেকে উপদেশ নেওয়ার মাধ্যমে মানুষের অন্তর নরম থাকে। আল্লাহ বলেন,

‘আপনি নিজেকে তাদের সৎসঙ্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, সে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না’ {কাহফ ১৮/২৮}।

জাফর বিন সুলায়মান বলতেন, ‘যখনই আমি আমার অন্তরের মধ্যে কঠিনতা লক্ষ্য করেছি, তখনই আমি মুহাম্মাদ বিন ওয়াছে‘-এর চেহারার দিকে লক্ষ্য করেছি’।

(৯) আত্মসমালোচনা করা : মানুষ যদি নিজে নিজের দিকে না তাকায়, তাহ’লে সে তার অন্তরের রোগের অবস্থা জানতে পারে না। তাই মানুষের উচিত তার প্রতিদিনের কার্যকলাপের দিকে নিজেই লক্ষ্য রাখা এবং ভাল কাজ অব্যাহত রাখা ও মন্দা কাজ ত্যাগ করা।

১০. দো‘আ করা : দো‘আ প্রত্যেক মুমিনের প্রধান হাতিয়ার এবং অন্তরের কঠিনতা থেকে পরিত্রাণকারী। অন্তরের চিকিৎসার জন্য নিম্নোক্ত দো‘আটি পড়া যায়, যা রাসূল (ছা.) করতেন, ‘আল্লাহুম্মা মুছার্রিফাল কুলূব ছাররিফ কুলূবানা ‘আলা তা‘আতিক’। অর্থ: ‘হে হৃদয় সমূহকে পরিবর্তনকারী! আমাদের হৃদয়গুলিকে আপনার আনুগত্যের দিকে ঘুরিয়ে দিন’।*১১* অন্য হাদীছে এসেছে, ‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন’।*১২*

পরিশেষে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে অন্তরের কঠিনতা থেকে রক্ষা করে সুস্থ অন্তর নিয়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন- আমীন।

~o~0~o~ সমাপ্ত ~o~0~o~

রচনাঃ
মুহাম্মাদ আবদুল ওয়াদূদ
তুলাগাঁও, দেবিদ্বার, কুমিল্লা।

*৬* মুহাম্মাদ ছালেহ আল-মুনাজ্জিদ, ঈমানী দুর্বলতা, (ঢাকা: আল-ফুরকান প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ-২০০৪), অনু: মুহাম্মদ শামাউন আলী, পৃঃ ৩৬।
*৭* মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৫৬; তাহক্বীক : আলবানী, ‘কিতাবুর রিক্বাক্ব; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৪৬৩।
*৮* মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৫৭ তাহক্বীক: আলবানী ‘কিতাবুর রিক্বাক্ব’।
*৯* হাকেম, হা/১৩৯৩; আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।
*১০* আলবানী, আহকামুল জানায়িয, মাসআলা নং ১১৯।
*১১* মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৪৭০, মিশকাত হা/৮৯।
*১২* তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১০২।

VN:R_U [1.9.7_1111]
রেটিং করুন:
Rating: 0.0/5 (0 votes cast)
VN:R_U [1.9.7_1111]
Rating: 0 (from 0 votes)

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের, লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর। শব্দনীড় ব্লগ কোন লেখা ও মন্তব্যের অনুমোদন বা অননুমোদন করে না।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

৪ টি মন্তব্য (লেখকের ২টি) | ২ জন মন্তব্যকারী

  1. বিষণ্ণময়ী : ০৬-০৮-২০১২ | ১৬:০৭ |

    অন্তর নরম করতে চাইলে সবাবস্থায় সৃস্টিকর্তার প্রতিটি পদ অনুসরণ করতে হবে, মানষিক ভাবে এবং শারিরিক ভাবে নিজেকে সংযত রাখতে হবে, নামাজ, কোরআন প্রতিদিন পাঠ করতে হবে। যখন আমরা ধর্মের নিয়ম কে নিজের ভিতরে লালন করতে পারবো আমার মনে হয় আমরা বিনয়ী এবং আমাদের অন্তর সর্বদা সৎ ও নরম থাকবে।

    আল্লাহ আপনাকে সব সময় হেফাজত করুন। আমীন।