১.
আমার স্বামী টাই পরা একদম পছন্দ করে না। টাই পরলে নাকি তার দম বন্ধ হয়ে আসে। নিশ্বাস খাটো হয়ে যায়। সেদিন অফিসে এক বড় কর্মকর্তা আসায় বাধ্য হয়ে টাই পরেছিল সে। অফিস থেকে যখন ফিরল, তখন তার মুখ কতটা যে বিকৃত ছিল তা না দেখলে কেউ বুঝতে পারবেন না । সে বলে, “এটা কেউ পরে ? নিজেকে ছাগল ছাগল মনে হয় । ছাগলের গলায় যেমন দড়ি থাকে তেমন । নতুবা কে যেন বন্দীর হাতে শিকল না পরিয়ে গলায় শিকল বেঁধে দিয়েছে।” আমি অবাক হই । তাই নাকি ? গলায় টাই পরলে নিজেকে ছাগল আর বন্দী মনে হয়! আমার স্বামী ছাগল হলে আমি কি মহিলা ছাগল? না, এরকম শব্দ বোধ হয় অভিধানে নেই। তাহলে ছাগী বলা যায় । আমার গলায় এই যে সোনার চেইন এ তো ছাগীর দড়ি নয়তো বন্দিনীর গলায় জড়ানো শিকল । আপনারা হয়তো হাসবেন । এই নারী কি বলে এসব ? এ তো অলংকার। নারীর সৌন্দর্য । আর আমার হাতে এই যে চুড়ি, আমার পায়ে এই যে নূপুর এইগুলোও কি অলংকার? না, আমার তা মনে হয় না । আমার মনে হয় এগুলোও শিকল । আমাকে ও আমাদের বন্দী করার কৌশল । আর আপনারা এগুলোকে অলংকার বলে চালিয়ে দিচ্ছেন । বাহ্বা, হে নরসমাজ আপনারা পারেনও বটে । এই সব শিকল ছাড়াও আরো একটি শিকল জড়ানো আছে আমার চারপাশে । সেটা অদৃশ্য, আপনারা দেখতে পাবেন না ।
২.
আমি যখন ইন্টারে পড়ি তখন আমার বিয়ে হয় । আমার ইচ্ছা ছিল পড়ালেখাটা চালিয়ে যাবার। কিন্তু আমার বাবাকে মুখ খুলে কথাটা বলা এভারেস্ট জয়ের মত । যেমন বাবাকে বিয়ের ব্যাপারে কিছু বলতে পারে নি আমার বড় দু’বোন। বলতে গেলে আমি তাদের চেয়ে একটু লাকি। কারণ ওদের বিয়ে হয়েছিল কাস টেনে, আর আমি তো কলেজে পা রাখার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। আমার বাবা আমাকে একটু বেশি আদর করতেন । তাই সাহস করে বললাম, আব্বু আমি পড়ালেখাটা চালিয়ে যেতে চাই । তিনি বললেন, যদি ওরা চায় তো করবি । আমি বেশ খুশি হলাম। আমাকে যখন শ্বশুর পক্ষের লোকজন দেখতে এল , আব্বু এক ফাঁকে আমার হবু শ্বশুরকে বললেন যে আমি বিয়ের পরও লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে চাই। হবু শ্বশুর বললেন, “নাউযুবিল্লা। এ কী বলেন! বউ হল ঘরের লক্ষী, ঘরে থাকবে । আর মেয়ে মানুষের এত পড়ালেখার দরকার কী ? পড়ালেখা তো কম করে নাই । না না আমি এইখানে ছেলের বিয়ে দেব না ।” তারপর ওনারা চলে গেলেন । আমার বিয়ে ভেঙ্গে গেল। বাড়ির সবার মন খারাপ। সবাই আমার দিকে কী রকম একটা দৃষ্টিতে তাকায় ! আমি বোধ হয় বড় অন্যায় করে ফেলেছি । মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে । আব্বুকে বললাম, “ঠিক আছে ওনাদের আবার ডাক। ওনারা যা চায় আমি তাই করব ।” এরপর আমার বিয়ে হয়ে গেল । বাড়িতে আমি সবার ছোট হলেও এখানে এসে হলাম বড় বউ । সারা সংসারের কাজকর্মের দায়িত্ব আমার । দেবর, ননদ আর স্ত্রীহারা শ্বশুরের সেবা করতে করতে প্রাণ আমার ওষ্ঠাগত । বিয়ের পর শ্বশুর বাড়িতে থাকলাম তিনবছর। আমার স্বামী থাকত ঢাকায় । আমার দেবরের বিয়ের পর শ্বশুর বললেন, এবার স্বামীর সেবা কর । তার মানে আমাকে এবার ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে । ভাবলাম যাক এবার যদি একটু স্বাধীনতা পাওয়া যায়। তাকে বলে যদি ঢাকার কোন কলেজে আবার ভর্তি হওয়া যায়! আমার স্বামী আমাকে নিয়ে এল এই ঢাকা শহরে। বেচারাকে বেশ সহজ-সরল মনে হল চেহারা সুরতে । কিন্তু দুদিনের মধ্যে বুঝিয়ে দিল যে, সে বাপকা বেটা । সেও একজন এ সমাজের(!) পুরুষ । তরকারিতে লবণ বেশি হওয়ায় আমার গালে কষে একটা থাপ্পড় দিল । সেই থেকে আমি তরকারিতে এক ধাপে লবণ দেই না । প্রথমে কম দেই তারপরে আস্তে আস্তে যোগ করি । সে বলে, সব সহ্য করতে পারি তরকারিতে বেশি লবণ সহ্য করতে পারি না । অবশ্য এই ডায়ালগ সে সবখানে দেয় । যেমন- কাপড় ধুয়ে চকচক না করলে সে বলে, সব সহ্য করতে পারি ময়লা কাপড় সহ্য করতে পারি না ।
আমি ছয় বছর থেকে এই ঢাকা শহরে আছি, আমার স্বামী একটা দিনও আমাকে বলে নি যে, চল কোথাও ঘুরে আসি । বাবুকে স্কুল নিয়ে যাওয়া আর নিয়ে আসা পর্যন্তই আমার ঘোরাঘুরি, এটুকুই আমার জগৎ । গরু ছাগলের চারণক্ষেত্রও বুঝি অনেক বড় । আমার অবশ্য এখন আর কোথাও যেতে ইচ্ছেও করে না । মনে হয় এই বেশ আছি । চারদেয়ালের এ জীবনই যেন আমার ও আমাদের প্রাপ্য । মনকে নাকি বেঁধে রাখা যায় না। যারা এই কথাটা বলে তাদের পশ্চাৎদেশে একটা লাথি দেওয়া উচিত। এই যে আমার মনটা বাঁধা পরেছে। কই আমি তো আর আগের মত স্বপ্ন দেখি না । যে ছুরি দিয়ে আস্ত গরু জবাই করা যায় তা ফেলে রাখলে তাতেও মরিচা পড়ে। এই চারদেয়ালের জীবনই কি আমাদের প্রাপ্য? গলায় চেইন বা হার, হাতে চুড়ি বা বালা আর পায়ে মল বা নূপুর নামের এইসব শিকলে শৃঙ্খলিত জীবন আমাদের জন্য কি বেমানান নয়? নাকি বড় মানান সই?
৩.
আমার স্বামী অফিস থেকে ফিরেছে । আজ তবে থাক । আর কথা না বাড়াই । আজ তরকারিতে ঝাল বেশি হয়েছে । প্রত্যেক ক্রিয়ার-ই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে; এই সূত্রানুযায়ী আমার স্বামী তার ডাবল ঝাল দেখাবে । আর শোনেন- আপনাদের যে এসব কথা বললাম তা আমার স্বামীকে বলবেন না যেন। কারণ আমি এর বিনিময়ে যে প্রতিদান পাব, তার প্রতিবাদ করতে পারব না ।
(নতুন গল্প লেখা হচ্ছে না। তাই পুরনো একটি লেখা দিলাম। লেখাটা একটু কাঁচা। আর অলংকারকে শিকলের সাথে তুলনা করার বিষয়টি সুমন্ত আসলামের একটা বইয়ে আছে। আমি পরে তা পড়েছি। )



লেখাটার সাথে কারো বাস্তব জীবনের মিল আছে কি ভ্রাতা?
মিল হয়তো আছে। কিন্তু আমি দেখি নি তাকে। অনেক পরিবারেই নারীরা তো এখনো চারদেয়ালেই আছে।
ভালো লাগলো । আমার কাছে কাঁচা মনে হয় নি
শুভকামনা অবিরত
ধন্যবাদ আরমান ভাই।
লেখা যথেষ্ট ভালো হয়েছে, লিখতে থাকুন, আরো লেখা চাই
শুভকামনা অবিরত
ইদানীং একটু চাপে আছি। তাই নতুন গল্প লেখা হচ্ছে না। মন্দা দশা শিঘ্রী কাটিয়ে উঠবো।
লেখা সুন্দর হয়েছে
ধন্যবাদ। আমি সমালোচনা আশা করি। কোনো জায়গায় দুর্বল লাগলে বলে দেবেন। এতেই বেশি খুশি হবো।
ভালো লাগলো একজন গৃহবধূর আত্মজীবনীমূলক এই গল্পটি।
একটু মেয়ে সাজলাম আর কী!

গলায় দড়ির গল্পটি পড়ে ইন্ডিয়ান গায়ক শানের বউয়ের কথা মনে পড়ে গেল।একটা গেইম শো অনুষ্টানে সবাই সবার স্বামীকে টাই নিজ হাতে পরাবে।তখন শানের বউ বলেছিল সে তার স্বামীর গলায় টাই বাধতে বা দেখতে পছন্দ করে না।তার কাছে টাই দড়ির মত লাগে।তার স্বামীর গলায় তাই দড়ি মানে টাই দেখতে চায় না।মেয়েদের বেলায় গহনা তখন বোঝা হয়ে দাড়ায় যেগুলো বাধ্য হয়ে গলায়,হাতে,পায়ে পড়ে রাখতে হয়।
আমার জানা মতে,বিয়ের পর চার দেয়ালে বন্ধী তাদের ভাগ্যে জুটে যারা বাপের বাড়িতে স্বাধীনতা বেশি পায়।
যাইহোক গল্পের সূত্রে অনেক কথাই বলে ফেলেছি।গল্পগুলো ভাল লেগেছে।

ধন্যবাদ মজাদার একটি ঘটনা শেয়ার করার জন্য।
লবন আর ঝোলের কেচ্ছাটা মনেহয় অনেকের ঘরেই আছে নীচ তলা থেকে উপর তলা পর্যন্ত লেখক তো এক রকম বললেন কেউবা হাড়িটা ছুড়ে মারেন ,কেউবা বলেন বাবুর্চি পাল্টাতে হবে। গল্পের ছলে হলেও সমাজের অবহেলিত সমস্যা ফুটে উঠেছে। লেখককে ধন্যবাদ
সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ আপনাকেও।
এই গল্পটাতো প্রায় সব মেয়েরই গল্প।

তবে ভাল লাগছে, একজন পুরুষ এই গল্পটা লিখেছে।
ভাল লাগল।
যদিও এই অবস্থা কাম্য নয়।
এই ভাবেই মনে হয় প্রতিটি পরিবারকে বাচতে হয়।
মুক্তি চাই এমন দশা থেকে।
লিখা ভালো অথবা সামান্য কম পছন্দের হতেই পারে। কিছুই আসে যায়না।
আপনার গল্প বলার চেষ্টা আমার পছন্দ হয়েছে। অপার অভিনন্দন।
হায়রে হতাশা

বইটার নাম জানার ইচ্ছে হচ্ছে
সুমন্ত আসলামের বইটা? ওটা সম্ভবত বাউন্ডুলে সমগ্রতে আছে।
অনন্য সুন্দর লিখনি।
একটু আস্তে