এটা তখনকার কথা যখন অনেক কিছুই মানতে পারতাম না । মনে তখন নানান ধরনের ক্ষোভ আর বেশ কিছু প্রশ্ন । দ্রব্য বিনিময় প্রথার কি খুব দরকার আছে ? পয়সা নামক বস্তু ছাড়া কেন কিছু পাওয়া যায় না ? হাওয়া বেলুন আঙ্গুল গলে কেন উড়ে যায় ? তিন -চার রাঙ্গা কাগজের চরকি বাতাসে ঘুরলে কেন সাদা দেখায় ? ঈদ কেন এত দেরি করে আসে আর তাড়াতাড়ি চলে যায় ?
এটা তখনকার কথা যখন চাঁদ রাতে মেহেদি পরে সকাল হওয়ার উত্তেজনায় বিছানার মায়ের শখের চাদরে দাগ লাগিয়ে বকুনি খেতাম । সন্ধ্যায় সাইরেন বাজার সাথে সাথে গলিতে সমবয়সীদের সাথে কোরাস গাইতাম _ …এক… দুই …তিন ; কালকে ঈদের দিন । । ঈদের চাঁদ দেখার জন্য হই হই করে ছাদে দৌড়ে যেতাম । ঈদের আগ পর্যন্ত নতুন জামা বের করে তার গন্ধ নিতাম, কাউকে দেখতে না দেয়ার আনন্দে বুঁদ থাকতাম ।
এটা তখনকার কথা যখন ক্লাস ফোর-এ পড়ি । ঈদের নতুন জামা নিয়ে উত্তেজনার স্পর্শকাতর সময় । বছরে একটা বিশেষ পোষাক নিয়ে জল্পনা -কল্পনার সময় ।
যৌথ পরিবারে আমরা ছিলাম অনেক ভাই বোন । সব বোনদের সেবার দল বেঁধে নিয়ে যাওয়া হল নাজমা টেইলার্স –এ । নাজমা টেইলার্স আমাদের এলাকায় তখন খুব নামকারা টেইলার্স । ঈদ ছাড়াও কাপড়ের ভীড়ে ঢুকা যায় না এমন । ডেলিভারি ডেট নিয়েও সমস্যা বাঁধে ।
কাপড় আগেই কেনা ছিল আমি আর আমার জমজ তুল্য চাচাত বোন সবসময় একই পোষাক পরতাম এমনকি রঙও এক থাকত । আমরা দুজন হাল্কা বেগুনি রঙের একটা টিস্যু কাপড় দিয়ে ক্যাটালগ দেখে পার্টি ফ্রকের ওর্ডার দিলাম । শুরু হল জামাটা আর ঈদ নিয়ে স্বপ্ন । জামাটার সাথে মিলিয়ে জুতো, ব্যন্ড সব কেনা শেষ । কিন্তু অপেক্ষাটা ছিল বেশ কঠিন পর্যায়ে কারণ ডেলিভারি ডেট ছিল ঊনত্রিশ রোজা ।
জামা আর ঈদ নিয়ে স্বপ্ন দেখে কেটে গেল সময় । সেদিন সন্ধ্যায় আমরা বোনরা অপেক্ষা করছিলাম । বার বার ছাদে, জানালায়, গলিতে ছুটে যাচ্ছিলাম । রিকশায় কাঙ্ক্ষিত মুখগুলো খুঁজছিলাম । যথাসময়ে আমার মা আর চাচী প্যাকেট বোঝাই করে নিয়ে এল । সবার জামা বুঝিয়ে দিতে দিতে আমাকে বলল, তোর জামাটা সন্ধ্যায় দিয়ে যাবে । আমি বুঝদার মেয়ে আহত হলাম কিন্তু কান্নাকাটি করলাম না । একই রকম দেখতে আমার চাচাত বোনের জামাটা দেখে খুশি লাগল । ভাবলাম এরকমই তো হবে আমারটাও ।
সন্ধ্যা হলো । রাত নামতে লাগল তবু কেউ এলো না ।এবার আমার মায়ের উৎকণ্ঠাও বাড়ল । আমার এক বড় ভাই গেলন দোকানে । উনি মাথা গরম মানুষ ! যা হওয়ার তাই হল । চূড়ান্ত মাথা গরম করে একটা লোককে ধরে নিয়ে ফিরে এসে জানালেন _“ মনে হয় জামাটা নষ্ট করে ফেলছে ” । বুড়ো লোকটা বলতে লাগল _না নষ্ট হয় নাই । অল্টারে দিছিলাম কারিগরের কাছে সে আসে নাই । রাতেই দিয়ে যাবে রাতে না দিলেও আমি কাল সকালে দিয়ে যামু । আমগো দোকান খোলা” । আমার ভাই কিছুতেই বিশ্বাস করছেন না । আমার প্রায় কান্না অবস্থা । আমার দিকে তাকিয়েই হয়তো ভাইয়ের মাথা আরো গরম হয় । লোকটাকে শূন্যে তুলে আছাড় দেয়ার প্রচণ্ড বাসনা ব্যক্ত করে । তিনি বার বার বলতে লাগেলেন ,
… বাচ্চা মানুষ এখন সামলামু ক্যামনে ? পড়ব কি ? এখন জামা কিনতে যেতে হবে । ।
লোকটা আল্লাহ রসুলের দোহাই দিয়ে আমার মাকে আশ্বস্ত করে যে – আর জামা কিনতে হবে না, সে নিজের হাতে জামাটা কারিগরের কাছে দিয়ে এসেছে, কাল সকালে নামাজের পরই সে নিয়ে আসবে । মা লোকটাকে বিশ্বাস করে না ভাইএর হাত থেকে লোকটাকে বাঁচায় কি ঠিক জানি না ।
আমি রাতে মেহেদী পরেছি কিন্তু তাতে আনন্দ পাচ্ছি না । গলিতে ছাদে হইচই করতে গিয়েও বারবার নিরব হয়ে যাচ্ছি । শিশুরাও কিছু ক্ষেত্রে অসম্ভব নিষ্ঠুর হয়, অন্যের কষ্টে প্রচণ্ড মজা পায় ঠিক তেমনি আমার অবস্থা দেখে – বোন, বন্ধুরা যেন খুব মজা পেল । জামাটার আসলে কী হয়েছে তা নিয়ে নানান ধরনের ভয় দেখাতে শুরু করল । ঈদে আমি জামা ছাড়া কী করব তা নিয়ে কিচ্ছা কাহিনী বানিয়ে বানিয়ে বলতে লাগল । সবচেয়ে বেশি ক্ষেপাতে লাগল আমার জানের-জান জমজ তুল্য জন । আমি কষ্ট পেয়ে ঘরে চলে এলাম। তারপরেও তারা পিছু ছাড়ে নি জানালা, দরজায় উঁকি দিয়ে ব্যড সাউন্ডের মত বলতে লাগল,_”…অভিমান করো না …তুমি কিগো বুঝো না” । । রাতে আর ঘর থেকে বের হলাম না ।
সকাল হলো । আমি মোটামুটি তৈরী হয়ে রইলাম । জামাটা পরা বাকি । বেলা বাড়তে লাগল । নামাজ পড়ে সবাই চলে এল । নতুন জামার খসখস শব্দ, চুড়ি টুংটাং,জুতোর টকটক শব্দ তুলে বোনরা সবাই তৈরী হয়ে বেড়াতে চলে গেল । যাওয়ার আগে আমাকে এসে সান্ত্বনার ছলে ক্ষ্যাপাতে থাকল । বড়রা যারা বাসায় ছিল সবার কাছেই ছিল এটা একটা মজার ব্যাপার । সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে আমার কান্না শুরু হল । কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম । মায়ের ডাকে ঘুম থেকে উঠে দেখি এক লোক এসে জামাটা দিয়ে গেছে । কিন্তু ততোক্ষণে বিকেল । ছোটোদের কাছে মোদ্দা কথায় ঈদ তখন শেষ । জামাটা হাতে নিয়েও তখন আমার তেমন আনন্দ হল না ।
ঈদে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা খুব কমই ঘটেছে । অনেক আনন্দের ঘটনাও ঘটেছে । কিন্তু আমার মনে পড়ছে না । এটা এই জন্য না যে মানুষ মূলত দুঃখবাদী । আমার মনে হয় সময় একটা অদ্ভুত ধারণা । অনুভূতিটাকে স্মৃতি হিসাবে বদলাতে গেলে অনেক কিছুই বদলে যায় । একসময়ের সবচেয়ে কষ্টের অনুভূতিকে পড়ে মনে হয় আনন্দের । তখন কি ভয়াবহ কষ্টই না পেয়েছিলাম কিন্তু এখন সে কথা মনে করতে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠছে না । বরং সুখানুভূতিতে চোখ নরম হয়ে যাচ্ছে ঠোঁটের কোণ বেঁকে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে ; আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম !
একটা জায়গায় পড়েছি একসময় সব হয় শুধু ইচ্ছেটা মরে যায় । সেই ইচ্ছের দিনগুলোকে সালাম । সেই সময়কে সালাম । আজ এই স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে এই গানটাই মনে পড়ছে,
“করি যে ভাবনা
সেই দিন আর পাব নাহ
ছিল বাসনা সুখি হইতাম
দিন হইতে দিন
আসে যে কঠিন
করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম….” । ।
——————
শাহ আব্দুল করিম
e
ছবিঃনেট থেকে সংগৃহীত




স্মৃতি কথায় দেখে এলাম আপনার
ঈদের রাঙ্গা শৈশব
সালাম জানবেন আপা

ভাল আছেন আশা করি
ঈদের নেমন্ত্রন রইলো,
প্রতিদিনের প্রার্থনায় আমার জন্য দোয়া করবেন
অবশ্যই দোয়া করব ভালো থাকুন।
ঈদ স্মৃতিকথা শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।
পরে কি পড়েছিলেন সে জামা?
হ্যা পড়েছিলাম ।আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।
সবারই তাইলে একটা কইরা দুঃখের গল্প থাকে!
দুঃখের কাসুন্দী সুন্দর হইছে। ভালো হইছে ফিনিশিং।
আপনার মুখে ভাল মানে অনেক কিছু।খুব খুশি লাগল ভাইজান।
ঈদ মানে আনন্দ। একজনার দু পয়সার দুঃখের কাহীনি হজম করতে না করতে জামার দুঃখ হাজির হইল। দুঃখের কাহীনি পইড়া ঈদের আনন্দের কাহীনি একটাও মনে পড়তেছে না। কি বিপদে পড়লাম? স্মৃতিতে শুধু দুঃখের কাহীনি ভর করতেছে। লেখনী শক্তির জোরে পাঠককে আনন্দ স্মৃতি রোমান্থনে বাধাঁগ্রস্ত করাই দুই জনারই বিচার হওয়া উচিত।
আপনে এই সমস্যাটার মোড় ঘুরাইয়া একটা আনন্দের ঘটনা তো লিখতে পারতেন! লিখেন নাই ।আপনার পোষ্ট এও কেদে আসলাম।
পড়লাম, ভালো লাগলো । সত্যিই ভালো লাগলো নিটোল ভালো লাগা, যেন
কোন অমায়িক বন্ধু আড্ডার মাঝে বসে তার গল্প বলছিলো আর আমি তাকে ঘিরে থাকা একজন …
পরে আসতেও পারি এই আড্ডায় এটা “শব্দনীড় ঈদ আয়োজন” একটি লিখা, বাকিগুলো পড়ি তারপর আসবো
অনেক ধন্যবাদ কবি।ভালো থাকুন।
আসলে দুঃখই চিরন্তন, সুখ ক্ষণস্থায়ী। ঈদের যত সুখস্মৃতি তা ভুলতে দেরী হয় না, সামান্য দুঃখও স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করতে থাকে।
গল্প হয়েছে দারুন! শুরু আর শেষ তো চরম আকর্ষণীয়!!
ঈদের শুভেচ্ছা।
অনেক খুশি লাগল জেনে।আপনাকেও ঈদের শুভেচ্ছা।
একজন কথাশিল্পী যখন স্মৃতিকথা লেখেন তা সাবলীল এবং চমৎকার গদ্য হয়। বেশ ভালো লাগল। এজন্য অভিনন্দন।
অনুপ্রেরণা পেলাম আসলেই।আপনাকেও অভিনন্দন।
ভাল লাগল।
ধন্যবাদ।
ভাই,
একটা জায়গায় পড়েছি একসময় সব হয় শুধু ইচ্ছেটা মরে যায় । সেই ইচ্ছের দিনগুলোকে সালাম । সেই সময়কে সালাম ।
অদ্ভুত কিছু জায়গা আছে এই লেখায়, খুবি সুন্দর, প্রানময়।
ভাল থাকুন,সুন্দর অনন্ত অফুরন্ত আনন্দে থাকুন।
অনেক ধন্যবাদ প্রিয় কবি।ঈদের শুভেচ্ছা।
দাদু ভাই, স্মৃতি চারণ দারুণ লিখেছো। ঈদ মোবারক। দুয়া করি ভালো থাকবা এবং প্রভু যেনো সহায় হন। দাদা ভাইকে সালাম দিও।

দাদা ভাইকে সালাম জানাইলাম ।সেও আপনাকে সালাম জানাল।অনেক ভালো থাকুন।
দাদু ভাই, দোয়া করি তোমরা মহা সুখে থাকো। ঈমানদার হও, পরহেজগার হয়ে তাকওয়া-হিদায়াত পাও এবং বেদায়াত – শিরিক থেকে বাঁচো। সর্বপরি জান্নাত প্রভু যেনো দেন।
ঈদের দিন নতুন জামা পড়তে পারবো না এটা তো ভাবাই যেতো না। তবু কয়েকটা ঈদ নতুন জামা ছাড়া করেছি সেদিন খুব কষ্ট হতো কিন্তু মা কে বুঝতে দিতাম না আর আমার কষ্টের আগে মা ই কান্না করতেন ঈদের দিন জামা কিনে দিতে না পারার দু:খে। আসলে এই স্মৃতিগুলো এখন খুব কষ্ট দেয় বেশী কষ্ট দেয় মা য়ের কান্নার কথা মনে হলে, কতোটা অসহায় ছিলেন যখন কোন ঈদে কিছু না দিতে পারতেন।
ভাল থাকুন সব সময়।
এখন নিশ্চয়ই এই কষ্ট নেই।কিন্তু সেই আনন্দ কী আছে?
ঈদের শুভেচ্ছা।
এই লিখা পড়ে ভাবছিলাম, হায়রে ছোট বেলা!
আমারতো বলতে ইচ্ছা করছে হায় হায়রে বড় বেলা
আগের দিন নাইরে নাতি .. .. .. ।
ঠিক বলেছেন ছাতু খাবার দিন আর নাই ।
ধন্যবাদ শেয়ার করার জন্য
ধন্যবাদ আপনাকে ও
ঈদ কথা পড়লাম।
ভালো লাগলো
ঈদ মোবারক সকাল দা।ভাল থাকুন।
এটা কি হল , এটা কি সুন্দর দিন কাটানো হল ।
যাওক স্মৃতি ভাল লাগল।
ছুভ কামনা ।
আমিও তো তাই বলি!

কাকে বলে সুন্দর দিন!!!!!!!!!!