এক
“বসে আছি পথও চেয়ে
ফাগুনেরও গান গেয়ে,
যত ভাবি ভুলে যাব
মন মানে না”।
জীবনের পীড়ন থেকে মুক্তি পেতে যা কিছু সম্ভাব্য উপায়ের কথা পৃথিবীতে প্রচলিত আছে তার মধ্যে মৃত্যুই হলো সর্বশ্রেষ্ট এবং মহান। যদিও মৃত্যুকে একমাত্র কল্পনা দ্বারাই অনুভব করা যায়। কেননা মৃত্যুর আগমন সংকেত কখনো পৌছলেও সেই মূহুর্তে মানুষকে আদ্যন্ত যা আলোড়িত করে তার নাম জীবন। মানুষ ছাড়াও জগতের অন্যান্য প্রানীসমূহ, একেবারে কীটানুকীট পর্যন্ত এ বোধের অর্ন্তগত। সকলকেই ত্রস্ত করে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা।
কারন পৃথিবীতে একমাত্র মৃত্যুকেই বলা হয় নিরপেক্ষ আশ্রয়। জীবন মানেই সুখ দুঃখের গলাগলি, আনন্দ-যন্ত্রনার সহাবস্থান।
নদী চলে গেছে প্রায় ঘন্টা দুয়েক হলো। কিন্তু তার সুবাস যেনো সারা ঘরময় ছড়িয়ে আছে। অনুচ্চ শব্দে উচ্চারিত তার হাসির রাশি যেনো এখনো ঘরময় উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। তার ওষ্ঠাধর নিংড়ানো সজীব আকুলতা এখনো আমার ইন্দ্রিয়কে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। শারিরীক কামনা আমাদের আরো অনেকদূর হয়তো নিয়ে যেতো। কিন্তু কেন জানি আলিঙ্গনের উষ্ণতায় উদ্বেলিত দু’টি হৃদয়ের স্পন্দন জৈবিক কামনাকে ছাড়িয়ে গেলো। আর এতেই আমরা দু’জনেই দু’জনার হয়ে গেলাম। কখনো ভাবিনি এভাবে কারো সাথে জড়িয়ে যাবো। ছন্নছাড়া জীবনে কেউ এভাবে এসে ঢেউ তুলবে তাও ভাবিনি কখনো। ভেসে বেড়ানো জীবনের নৌকোটিকে কোথাও ভেড়াতে হবে এমন চিন্তাও আসেনি মাথায়। অথচ কোথা থেকে কি হয়ে গেলো। পদ্মা পাড়ের ছোট দ্বীপের মতো এক গ্রাম,নদীর কোল ঘেষে সরু রাস্তা, চারদিকে সবুজে ঘেরা, পাশ দিয়ে সারি সারি আখক্ষেত, আখক্ষেতের পাশ দিয়ে গ্রাম্যমেঠো পথ। সেই গ্রামের এক অতি সাধারণ সুন্দরী যুবতী এসে একপ্রকার জোর করে জাগিয়ে দিলো মন অনুভূতি। তার মধ্যে তারুণ্যের উচ্ছলতা আছে, উন্মত্ততা নেই। সে যথেষ্ট ধীরস্থির আর রিজনেবল। বিলাসিতার চেয়ে প্রয়োজনের দিকে নজর। অসময়ে শুয়ে শুয়ে এসব ভাবছে সৈকত। দূপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছে ওর মধ্যে তুমুল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এ ঝড় ভালবাসার ঝড়, প্রথম প্রেমের অনুভূতির ঝড়। ঝড়ের পূর্বাভাস বলে দেয় ক্ষতির পরিমান কেমন হবে। অনেক সময় সে পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে যায়। প্রকৃতিতে ঝড়ের ক্ষতি প্রত্যক্ষ করা যায়, আবার কিছু কিছু ক্ষতির ক্ষতিপূরনও সম্ভব। কিন্তু হৃদয় ভাঙ্গার ক্ষতি প্রত্যক্ষ করা যায় না, এটা হৃদয় ঘটিত তাই হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। এ ক্ষতির ক্ষত কাউকে দেখানো যায় না, কাউকে বলা যায় না, কারো কাছে ক্ষতি পূরনের দাবীও জানানোর সুযোগ নেই। এটা শুধু নিজের ভিতরই বয়ে বেড়াতে হয়।
জানি, মানুষের জীবনের সকল আশা-আকাঙ্খা, সাধ-স্বপ্নের যখন মৃত্যু ঘটে তখন শুধু বিগত দিনের স্মৃতিগুলোকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকা যায় না।স্মৃতির মধ্যে সুখ নাই, শান্তনা নেই। আছে শুধু ব্যথা, বেদনা আর দীর্ঘশ্বাস। স্মৃতি, সেতো অতীত। সুখের হোক আর দুঃখের হোক, বর্তমানে তার উপস্থিতি দুঃখজনক। শুধু আমি কেন, পৃথিবীর যে কোন মানুষ যে কোন মুহুর্তে একবার যদি অতীতের সকল সাগর মন্থর করে তাহলে তার ভেতরে একটু না একটু বেদনার উদ্রেক হবেই। যাকে চেয়েছিলাম তাকে পাইনি, যা আশা করেছিলাম তা হয়নি। যা স্বপ্নে দেখেছিলাম তা স্বপ্নরাজ্যেও বেশীদিন স্থায়ী হতে পারেনি। কঠিন বাস্তবতার সুকঠিন নিষ্পেষনে তা কুড়িতেই ঝরে পড়ে ধুলির সাথে মিশে গিয়েছে। তার স্মৃতিও মুছে গেছে পৃথিবী থেকে।
কিন্তু যাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেতো আজ পর্যন্ত আমার মনের পাতা থেকে মুছে যেতে পারেনি। তার সেই মুখ, সেই চোখ, সেই দেহ, সেই রুপ সবই আমার মনের গহ্বরে ছবির মত স্পষ্ট হয়ে জেগে আছে। হ্যাঁ, আয়নার মতই তার মুখখানি ভাসছে আমার চোখের সামনে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ভাসছে। কিন্তু তার সেই রুপ দেখেই তাকে আমি ভালবাসিনি, ভালবেসেছিলাম তার ভালবাসা পেয়ে।সে বুঝি সত্যিই আমাকে ভালবেসেছিল। বুঝি গভীর ভাবেই বেসেছিল। হয়তো তাই বিয়ের পরও নিজকে আজো সুখী ভাবতে পারেনি। সুখ হলো মনের ধন সম্পদ কাউকে কি প্রকৃত সুখী করতে পারে ?
The human mind is a device for survival and reproduction, and reason is just one of its various techniques (Edward O. Wilson)
(মানুষের মন বা স্মৃতি হল টিকে থাকার অবস্থা এবং পুনরায় তৈরী করার জন্য পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন কেৌশলের একটি কারন।)
দুই…..
“কাঁদালে তুমি মোরে। ভালোবাসারই ঘায়ে
নিবিড় বেদনাতে”।
ভালোবাসা এমন এক অনুভূতি বা সম্পর্কের নাম, যার আঘাতেও সুখ! এই আঘাতে কান্না এলে, বেদনা থাকলেও গোপন একটা সুখ থাকে। প্রকৃত ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়! বিবিধ জ্ঞানের বিবিধ উত্তরের ভারে ভালোবাসা আজ বড্ড ভারাক্রান্ত। তবুও ভালোবাসা বেশ রাজকীয় কায়দায় জেঁকে বসেছে সবার হৃদয়ে। একেক পরিস্থিতিতে একেক ব্যক্তির কাজে প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়ে বিবিধ সংজ্ঞায় নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে সে নক্ষত্রের মতো অবস্থান করছে আর তাকে ঘিরে ঘুরছে সুখ, দুঃখ, হাসি, কান্না, কষ্ট, বেদনা, আদর, স্নেহ-যন্ত্রণা নামক অনুভূতিগুলো। ভালোবাসা সম্পর্কিত প্রচুর ধারণা, প্রচুর অভিজ্ঞতা থাকার পরও কবিগুরুর মনে প্রশ্ন জেগেছে, ভালোবাসা কারে কয়? আসলেই প্রশ্নটা জটিল, উত্তরটাও।মানবহৃদয় ভালোবাসাকে জানার জন্য আকুল চিরকাল। ভালোবাসা আসলে কী? জীবন নিংড়ে ভালোবাসা, আদর্শ আর চেতনা সবাই ধারণ করতে পারেন না। অস্তিত্বশীল জীবনের তাড়নায় সৈকত রাজপথে হাজির করেছিল নিজেকে। ভীষণভাবে চিনে ছিল নিজের সত্তাকে। এই চেনা ছিল তার ফেলে আসা জীবন থেকে ভিন্ন।
প্রেম মানুষের জীবনের বহির্বাস্তবতাকে অতিক্রম করে অন্তজীবনের এক দুর্ভেদ্য রহস্যলোকে জাদুবাস্তবতা চৈতন্য প্রবাহরীতির প্রয়োগে মনোজগতের যে উচ্চতায় অধিষ্ঠিত তার ছোঁয়া সৈকতের শিরা-উপশিরায়ও তুলেছিল দুর্দান্ত শিহরণ, এই শিহরন মানুষের স্বপ্ন-বিদ্ধ জীবনের এক অন্তর্ভেদী আখ্যান। মধ্যবিত্ত জীবনের এক অন্তহীন অসঙ্গতি কাব্যিক ব্যঞ্জনা নিয়ে সৈকতের জীবনকে করেছে আলোড়িত। যে সমাজে সৈকতের আজন্ম বেড়ে উঠা সেই সমাজের মানুষগুলো জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্তু, অপ্রাপ্তির বেদনায় জর্জরিত সংসার জীবনে ব্যর্থ। তাই জীবনকূপের গহ্বরে তারা ঢেলে দিতে চায় স্বপ্নের গরল। ফলে বাস্তবতা ও কল্পলোকের মাঝে তৈরি হয় স্বপ্ন-সাঁকো।সেই স্বপ্ন সাঁকোর উপর ভর করেই জীবন এগিয়ে চলে সামনের পানে।কিন্তু সমাজের ধরাবাঁধা নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়েও বাইরে মনের গহীনে সে সম্পর্ণ অন্য মানুষ। স্বপ্নের ডালপালা বেয়ে যেতে যেতে সে নিজেকে গঠন করার চেষ্টা করে একজন সমাজ সচেতন সাধারন মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান হিসাবে। হঠাৎ তার ছক বাধা জীবনে নদীর আগমন তার সহজ সরল সাধারন গ্রাম্য স্বপ্নে লালিত জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। কঠিন বাস্তবের ধাক্কায় তার স্বপ্ন জগত ধসে পড়ে মিনিষেই।
এক সময় সে দেখতে পায় সে শুধু নদীর পাশে অযত্ম অবহেলায় অরক্ষিত এক সৈকত, তার বেশি কিছু নয়। এভাবেই মধ্যবিত্তের স্বপ্নজগৎ আর বাস্তবতা। নদী সৈকতকে ভালবাসার রংঙ্গীন স্বপ্ন দেখায়, মনে প্রানে ভালবাসে, বিভিন্ন ভাবে সেই ভালবাসার আকুতি প্রকাশ করার চেষ্টা করে কিন্তু সৈকত বরাবরই না বুঝার ভান করে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু নদী নাছোড় বান্দা। তার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।সেই চেষ্টার বর্হিপ্রকাশ ঘটায় সৈকতকে নদীর প্রাইভেট টিউটর হিসাবে নিয়োগ দানের মাধ্যমে। শিক্ষক হিসাবে প্রতিদিন একবার করে দেখার সেৌভাগ্য অর্জন করার আনন্দে নদী আত্মহারা। কিন্ত এর মধ্যে ঘটতে থাকে আর এক ঘটনা। নদীর বড় বোন মেৌমিতা সৈকতের প্রতি অনুভব করে গোপন প্রণয়। যদিও মেৌমিতা মনের কথা শেষ পর্যন্ত বলতে পারেনি, কিন্তু মেৌমিতার ব্যবহার, আচার-আচরন থেকে প্রকাশ পায়, ছোট বোনের ভালবাসার কথা জানার পরও সৈকতের প্রতি ব্যক্তিগত টান অনুভব করে।কারন মেৌমিতারও একটি ব্যক্তিগত জীবন আছে এবং সেও একজন রক্ত মাংসের নারী, সেও কামনা করে একজন পুরুষের নির্মল ভালোবাসা। সেই ভালোবাসাপূর্ণ দৃষ্টি সে খুঁজে পেতে চায় সৈকতের চোখের আলোয়। জীবনের বিরল অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ এই নারী-পুরুষের দৃষ্টির অর্থ বোঝে, সৈকতকেও বোঝাবার চেষ্টা করে। এ কারনেই মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েরা আত্মীদের দ্বারাই প্রথম যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। ধীরে ধীরে সে শরীর সচেতন হয়ে ওঠে এবং বুঝতে শেখে সে একটি নারী শরীর, যার দিকে হাঁ মেলে থাকে সহস্র লোলুপ দৃষ্টি। সেও তখন মনে করে তার শরীর স্বাস্থ্য যেন কালো পাথরে খোদাই করা অপরূপ ছন্দিত মূর্তি।
কিন্তু কোন ভাবেই মেৌমিতা সৈকতকে কাছে টানার রাস্তা খোজে পায় না।সৈকত যখন নদীকে পড়ায় তখন বিভিন্ন অজুহাতে নদীর পড়ার ঘরে বারবার আসে মেৌমিতা। তারপরও সৈকতের দৃষ্টি আকর্ষন করতে ব্যর্থ হয়।এভাবে মেৌমিতার স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনার মধ্যদিয়ে এগোতে থাকে নদী –সৈকতের শিক্ষক ছাত্রীর সম্পর্ক।মেৌমিতারও স্বপ্নেরও অকালমৃত্যু ঘটে।
তিন…
ভরা বর্ষায় জোসনা রাতে পদ্মার অথৈ জলতরঙ্গের সঙ্গে চাঁদের আছড়েপড়া রূপের সৌন্দর্য নবযৌবনা সুন্দরীর রূপকে হার মানায়। সেই বর্ষা এখন নেই। নব যৌবনা ভরা পদ্মা এখন হেমন্তের মরা কঙ্কাল।তারপরও জোসনার আলো স্বচ্ছ কাচের মতো পানিতে পড়ে এক অপরূপ দৃশ্য সৃষ্টি করে। একদিকে জোসনা ও জলের নান্দনিক সৌন্দর্য, আরেকদিকে অকাল বন্যায় সর্বনাশী পদ্মার ভাঙ্গন কীভাবে কৃষকের সর্বস্ব ভেসে যায়, ফসল তলিয়ে যায় তার ক্ষতচিহ্ন। জোসনার নিচে বুকের গভীরের বেদনা কীভাবে কৃষকের চোখের কোণে চিক চিক করে ওঠে। প্রকৃতির রূপ ও মানুষের মোটা ভাতের স্বর্গসুখই সৈকতকে শক্তি যোগায় বেঁচে থাকার, সামনে এগিয়ে যাবার জীবন কাটানোর। গ্রামীণ জনপদের মরমী মানুষের সঙ্গে জীবন কাটানোর সুখই আলাদা। বুক ভরে বিস্তীর্ণ পদ্মার পাড়ে দাঁড়িয়ে শ্বাস নিতে যে কী সুখ, সেটা এখানে না এলে, মাটির কাছাকাছি না থাকলে অনুভব করা যায় না। মাঝে মাঝে ভরা পূর্ণিমার জোসনা রাতে সৈকত নদীর তীরে ছুটে আসে, যেখানে নদী তার ভালবাসার কথা প্রথম বলেছিল। সেখানে আনমনে বসে থাকে, দেখে জোসনার আলো পানিতে পড়ে জ্বলজ্বল করছে, ভরা জোসনার আলোতেও নিজ জীবনের ফেলা আসা অতীতকে অন্ধকার গলি পথের সাথে মিলিয়ে মরমী সাধক শাহ আবদুল করিমের বন্ধু হারানোর বিচ্ছেদ বেদনাময় সুর মনের অজান্তে বেরিয়ে আসে-
কেনো পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি ।।
ক্যামনে রাখিব তোর মন,
আমার আপন ঘরে বাদি’ রে বন্ধু
ছেড়ে যাইবা যদি ।
মাঝে মাঝে বসে থেকে বুঝতে পারে না কখন রাত্রি শেষ প্রহরে চলে এসেছে। ফজরের আযানের সুর কানে ভেসে আসলে বুঝতে পারে রাতের শেষ বিদায়ের প্রস্ততি শুরু হবে অল্প কিছুক্ষন পর। এভাবে কত রাত যে নির্ঘুম কেটেছে তার ইয়ত্তা নেই। একদিন যার হাতের স্পর্শে শিহরিত হয়েছিলে সৈকত, সে এখন তার পাশে নেই তারপরও তার কথা ভুলে যায় না।তবে ওই হাতের স্পর্শ-ছলনাই সবচেয়ে বেশি ঠকিয়েছে তাকে!
প্রায়ই বন্ধু মিজান প্রশ্ন করে রাতে প্রায়ই তোকে পাওয়া যায় না কোথায় থাকিস। সৈকত এই প্রশ্নের উত্তর সব সময়ই এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছে। তবে মিজান জানতো নদী সৈকতকে ভালবাসে। কিন্ত সৈকত নিজের প্রতিষ্ঠা, নিজের অবস্থানের কথা চিন্তা করে নদীকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতো। এড়িয়ে চলার পরও শেষ রক্ষা হয়নি। পড়ানোর সময় বিভিন্ন ভাবে নদী তার আচরন দিয়ে বুঝাতে থাকে যে সে সৈকতকে ছাড়া কোন কিছুই কল্পনা করতে পারে না। নদী তার বড় ভাইকে ব্যবহার করে সৈকতকে নিজের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে প্রকৃত পক্ষে তাকে কাছে কাছে রাখার এবং প্রতিদিন দেখার জন্য। নদীর ভাই সৈকতকে খুব আদর করত। তাই সৈকতও তাকে না করতে পারেনি। তাছাড়া সৈকতের সবে মাত্র পরীক্ষা শেষ হয়েছে হাতে সময়ও আছে। নদীকে পড়ানোর পর প্রায় সময় ওদের বাড়ীর পাশের মাঠে ভালবল খেলত সৈকতসহ আরো অনেকে। যতক্ষন সৈকত মাঠে থাকত নদী ততক্ষনই জানালার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে থাকত। অন্য সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে গেলেও বন্ধু মিজানোর অনুসন্ধানী চোখকে এড়িয়ে যায়নি। মাগরিবেব আযান হয়েছে । খেলা শেষ করে সৈকত ও মিজান মসজিদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে অজু করার জন্য। নামায শেষে মসজিদ থেকে বেড়োনোর পর মিজানের মিজানের প্রশ্ন কিরে নদীর খবর কি?
-তারমানে
-মানে অতি সোজা। শিক্ষকের কাছে সুন্দরী ছাত্রীর ভাল মন্দের সংবাদ তো থাকার কথা।
-তুই কোন ধরনের সংবাদের কথা বলছিস ?
-তুই যেটা বুঝেছিস সেটার খবরই বল। তোর সাথে প্রতিদিন পড়ার টেবিলে নদীর দেখা হবার পরও প্রতিদিন খেলার সময় দেখি এক নজরে জানালার গ্রিল ধরে দাড়িয়ে থাকে ব্যাপার কি বন্ধু? আবার মৌমিতাকেও দেখি মাঝে মাঝে ওকে শাসন করতে। তুই কি মৌমিতার প্রেমে পড়েছিস ?
-আরে আমি কি করে বলব? কার জন্য দাড়িয়ে থাকে। হয়তো অন্য কারো জন্য দাড়িয়ে থাকতে পারে। আর মৌমিতার ব্যাপারটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। কেন নদীর উপর জোর খাটায় আমার জানা নেই। তবে প্রায় সময়ই পড়ার ঘরে বিভিন্ন অজুহাতে মৌমিতা আসে, বসে থাকে, কি যেন বলতে চায়।
-কি বলতে চায়, কখনো জানার চেষ্টা করিসনি ?
-কি জানার চেষ্টা করব ?
-কেন বারবার আসে, কেন বসে থাকে ?
-সেটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। জানাটা আমার জন্য জরুরী নয়। তোর যদি জানার ইচ্ছা থাকে তাহলে মৌমিতাকে বলব তোর কথা।
- আমার কথা বলতে হবে না। আমি কিছুটা জানতে পেরেছি নদী এবং মৌমিতা দুজনেই তোকে ভালবাসে। ওদের দুই বোনের মধ্যে একটা ঠান্ডা প্রতিযোগীতা চলছে। অচিরেই তুই তার প্রমান পাবি।
- (আনমনে, আরে আমিও তো জানিরে বোকা। কিন্ত আমি কি করে তোকে বুঝাব আমি কি অবস্থায় নদীকে পড়াতে আসি।) তোর ধারনা কতটা সত্য সে তর্কে যাব না, তবে তোকে বলতে হবে তুই কি ভাবে অনুমান করলি ?
- আমাকে নদীর বড় ভাবী বলেছে। বড় ভাবী বলেছে!
-হ্যাঁ, গত সপ্তাহে যখন আমাদের ওখানে গিয়েছিল তোর কথা জানতে চাওয়াতে অনেক কথাই বলেছে। প্রসঙ্গত: নদীর বড় ভাবীর বাড়ী মিজানদের বাড়ীর পাশে।
- বলতে পারে।তবে আমার কি করার আছে ? তোর কাছে আমি কিছুই লুকাই না। আমিও দেখতে পাচ্ছি ওরা দুজনেই আমাকে ভালবাসে। তবে মৌমিতা বিভিন্ন ভাবে তা বোঝাতে চেষ্টা করে এখন অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়েছে মনে হয়।
- না হাল ছাড়েনি। বড় ভাবীকে বলেছে তোকে বলার জন্য যে,মৌমিতাকে পড়াতে হবে। তোর অনুমতি পেলে নাকি বড় ভাইকে বলবে। তারপর তোকে বলবে।
-আমি কি বলব ? ভাই যদি বলে তবে তো আমি না করতে পারব না। তাছাড়া যেহেতু নদীকে পড়াচ্ছি।
তবে, তাহলে শোন — মৌমিতার দুটি চোখ সব সময় শুধু একপাক্ষিকভাবে আমাকে ওর প্রতি আসক্ত রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু আমি কোনোদিনই মৌমিতাকে ভালবাসার কথা চিন্তাও করি নাই।এমন কি ওর দিকে ফিরে তাকায়নি। কিন্ত যে তাকে ভালোবাসে না, তার দিকে একবারের জন্যও ফিরে তাকায় না, তার জন্যে হৃদয় নিয়ে বসে থেকে কি লাভ। এখন বল, এটা কি কোনো প্রেম? কথা বলছিস না কেন? বল। আমি জানি মানুষ উত্তেজিত হলে ভেতরের আসল মানুষটা বেরিয়ে আসে।
চার…
কি আশায় বাধি খেলাঘর, বেদনার বালুচরে।
নিয়তি আমার ভাগ্য নিয়ে যে, নিশিদিন খেলা করে……
ধীরে ধীরে জীবন শেষ বেলার চৌকাঠে। পশ্চিমের কোলে সূর্য ঢলে পড়েছে বিষন্নতায়। রেখে গেছে মিষ্টি আলোর আভা। দিন বিদায়ের কমলা আভা ছড়িয়ে পড়েছে আমার হৃদয়ের আকাশে। তারপরও আকাশ মেঘমুক্ত নয়। কমলা আভার পাশেই নীল বেদনার রেখা হৃদয়ের নির্মল আকাশকে ঢেকে রাখার অপেক্ষায়। তবু বহুদিন এ ধরনের দৃশ্য থেকে বঞ্চিত। আসলে যান্ত্রিকতা, আধুনিকতা এবং বিজ্ঞানের অপরিহার্য চাপে সব ভুলতে বসেছি আমরা। ডালে ডালে ঘরে ফেরা পাখির কিচিরমিচির শব্দ দৃশ্যগুলো মন কেড়ে নিতে একটুও দ্বিধা করে না বরং অসীম সাহস হঠাৎ করেই মনের মন্দিরে ঢুকে পড়ে। কষ্ট আর অভিমানে ফেটে যাওয়া আমাকেই দেখলে কিন্তু ভালোবাসার উত্তপ্ততা অনুধাবন করলে না। হঠাৎ কিছু না বলে কেন চলে গেলে বসন্তের ভূমি থেকে, এও কি সম্ভব। একি বাস্তবের বৈভব নাকি এটাই জীবন? অথচ অযথা ভালোবাসার ভেলায় চড়িয়ে প্রেমের উত্তাল সমুদ্র পার করার কথা বলেছিলে। কোথায় গেল সেই প্রতিশ্রুতির কথা? মহানুভবতার কোষে এখন বিষ পিঁপড়ার বসবাস।
মিথ্যে ভালোবাসা নগদ-প্রাপ্তির জন্য মরিয়া হয়ে থাকে, যত দ্রুত সম্ভব অর্জন আর ভোগে বিশ্বাস করে। কারণ, মিথ্যে ভালোবাসাতে হারানোর ভয় একটু বেশি থাকে। সত্যিকারের ভালোবাসার সঙ্গে কোনো অস্থিরতা মিশে থাকতে পারে না। কেননা, সত্যিকারের ভালোবাসায় হারাবার কোনো ভয় থাকে না, আবার মনের মানুষটাকে নিশ্চিত পাবার বিষয়েও কোনো সন্দেহ থাকে না। তাই সত্যিকারের ভালোবাসার গতি বা চলন হয় অস্থির, নয় ধীরস্থির। কারো মুখে হাত দিয়ে নিজের চরিত্রের দুর্বলতা চেপে রাখা যায় না।
তোমার কি মনে আছে, তুমি বলেছিলে— ‘যথার্থ প্রেমিক যদি তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো মারাত্মক অপরাধও করে ফেলে তবে তার প্রেমিকার উচিত তাকে ভুল না-বোঝা।’ সেদিন আমাদের দুজনার মধ্যে কথা ছিল, আমরা আমাদের প্রেম-দুঃখের অবসান ঘটাবো এক মধুর মিলনে। আর তাই আমরা এক অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার নিয়তিকে মেনে নিয়েছিলাম সামান্য বিরহকে স্বীকার করে নিয়ে। তুমি আমার স্বেচ্ছানির্বাসনের অন্তরায়ের ভেতর আমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছিলে — আমরা এক মধুর মিলনের অপেক্ষায় থাকবো। কিন্তু তুমি তোমার কথা রাখোনি
বুকে না, না, বুকে নয় হার্টের করোনারীতে হাত রেখে সত্যি করে বলো, কতটুকু অস্তিত্ব আছে তোমার নিজের হাতে জ্বেলে দেয়া নিভু নিভু ভালবাসার প্রদীপটায়, আর তাইতো সমাজের তো দূরের কথা, সমুদ্রের ভয়াল তরঙ্গ একেবারে পুরোপুরি নি:শব্দ হয়ে গেল। থেমে গেল রঙ চঙা জীবনের ঢং ঢং ঘন্টা।
চারপাশ নি:শ্চুপ হলেও জীবন থেমে থাকে না। বহতা নদীর মতো বয়ে যায়। এক পর্বের সমাপ্তি দ্বিতীয় পর্বের অর্থাৎ দীর্ঘ দু:খের সুগম রাস্তা তৈরি হয়ে যায় আপণে আপনা। এর জন্য কে দায়ী আমি না নদী। প্রায় অনেক বছর তার সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রাখার চেষ্টা সবই যখন বৃথা তখনই ত্যাগ করার মনস্খির হয়ে গেল। সত্যকে উপেক্ষা করার সৎসাহস কারোরই নেই। প্রবঞ্চনার যন্ত্রণায় নীল হতে হতে সাত সমুদ্র তের নদী এবং কিছু অহেতুক স্মৃতিকে পিছনে ফেলে রেখে অবশেষে মাটির টানে মা এবং মাতৃভুমির আর্কষনে স্বদেশেই প্রত্যাবর্তন। অহেতুক বটে। যে স্মৃতি বাঁচার আশ্বাস দিয়েছিল। সুখের ফোয়ারা বয়েছিল আজ তা নিস্তব্ধ। ব-দ্বীপের প্রতি ভালবাসার টান সত্যি আঁচ করা গেল। অথচ ভালভাবে বাঁচার ইচ্ছা নিয়েই দেশান্তরিত হয়েছিলাম। জন্মেছিল স্বপ্নের জানালায় সুবর্ণ উচ্চাশার অর্কিড। অথচ জঞ্জাল আবর্জনায় ভরা সময়ের পঙ্কিল স্রোত সব ভাসিয়ে নিয়ে গেল। স্রোতকে প্রতিরোধ করার অক্ষমতা বেড়েই চললো ক্রমেই। ডুবে যাচ্ছিলাম ভালোবাসাহীন পঙ্কিল কাদায়। ভাঙনের তীরে বসে শুধু অসহায়ের মতো সমুদ্রের ঢেউ গোনাই একমাত্র কাজ। তবে মনের গভীরে ছোট ছোট স্বপ্নের স্রোত ধারার অভাব ছিল না। তাই হয়তো সে স্রোত ধারাকে বহতা নদীর তীরে উর্বর পলি সমৃদ্ধ সৈকত বানাতে পেরেছিল।
আশা ও আশ্বাসের পথ আঁকড়ে ধরেই তোমার তিক্ততা মিশানো ভূমিহীন দলিলে কোন একদিন নির্বিকার চিত্তে সই করেছিলাম বসত বাড়ির প্রয়োজনে। বুঝতে ভুল করেছিলাম, তুমিতো ছিলে গোত্রহীন উদাসী নক্ষত্র। বিলাসী অন্ধকার কুড়ে কুড়ে খেয়েছে স্বাধীনতা। মননে কেবলি ধ্যান, নির্বোধ প্রতিবিম্বর ছায়া, বোঝাপড়া ক্রমশ: পলাতক অবিশ্বাসের আবর্ত, রক্তের অক্ষর, আবেগ অনুভূতির সব কিছুই যেন বিলুপ্তি বাসনাতে ব্যস্ত বাঁধভাঙ্গা বন্যার পানির মতো উপচেপড়া বীভৎস ক্রাইসিস হঠাৎ ঢুকে পড়ল দু:শ্চিন্তার শরীরে। ভাবনার প্রহর শুধু প্রলম্বিত হয়, কোন নির্দিষ্ট গন্তব্যের প্রকাশ মিলে না। ভাবনার সাগরে হাবুডুবু খেতে ভাল লাগে না। ক্লান্তির ক্রান্তি লগ্ন। ব্লাড প্রেসারের বাড়াবাড়ি।শরীরে বাসা বেধেছে চিন্তা নামক ঘুনপোকা। স্বপ্নের চোখে ঘুম ধরেছে তবুও স্বপ্ন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। দীর্ঘ নি:শ্বাসে জানালার কাঁচে কষ্টের কিছু শিশির জমেছে শাসিত চাঁদের ম্লান আলোয় যদিও গোচরের বাইরে। তবে আমার চোখ নড়ায়নি। থেকে থেকে কাঁদি। উত্তেজিত হয় নির্ঘুম রাত, রাত যায় গভীরে কিন্তু ঘুম নামের শব্দটা এখন মরিচীকা। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার আকাশের বুক থেকে খসে পড়ল যেন একটা উল্কা।
কোথায় পড়লো কোনদিন হয়ত তলিয়ে দেখা হবে না। হয়তবা আমরই মতন এক ধরনের পতন তার হয়েছে এটা নিশ্চিত। কত তারা ঝরে পৃথিবী কি তা মনে রাখে। এভাবেই কেটে যায় বছরের পর আমার বিনিদ্র রজনী। কঠিন বাস্তবের দেয়াল চারপাশে, ইচ্ছা করলে জীবনের রঙ ছবি টাঙ্গানো যায় না। সারাক্ষণই কসাই এর আনাগোনা আমায় বুলিয়ে রাখে। মাংসপিণ্ড ছাড়িয়ে নেয়, পড়ে থাকে স্বপ্নের কিছু কংকাল। তবুও সবুজ কাঠের শব্দের ভিতরে বেজে ওঠে সেই সুর। অশান্তির কালো ছায়া এসে ঢেকে দিয়ে যায় সুদূর ভবিষ্যতের পথ।
জাগিতে এসেছি রাতি, শুধু জাগিতে এসেছি রাতি
জাগাতে আসিনি গো …
আমি নহি তবো মিলন বাসরও সাথী
আমি আজ দুর আমি ভুলে যাওয়া
ঝরা ফুলও বনে বৈশাখী হাওয়া
অতীতও দিনের আঁধার শ্বশানে
আমি যে স্মৃতি বাতি…………..
পাঁচ….
“নাইবা ঘুমালে প্রিয়ও রজনী এখনও বাকী
প্রদীপ নিভিয়া যায় শুধু জেগে থাক তব আঁখি”।
রাতে তোমার সাথে দেখা। কোন অচেতনে জানি তোমার হাতে লেগে গেল আমার হাত, সেই স্পর্শ শিহরনকে নিয়ে হলো কথা।আর সে রাতেই তুমি আমার সরল-মুগ্ধতার সুযোগ নিয়ে উঠে এসেছিলে আমার শোবার ঘরে।
তুমিই সেই সুযোগ করে দিয়েছিলে আর হ্যাঁ, আমিও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গিয়েছিলাম তোমার ঘরে কেননা, তখন তুমি আমার স্পর্শ-ভালোবাসার কথাই ভাবছিলে তোমার সেই ভাবনা আমাকে পাগল করে দিয়েছিল, আজও ধন্য মানি তোমার সেই ভাবনাকে। তোমার সেই ভাবনার সঙ্গে একটি কচি মনের পবিত্র-সরলতার যোগ ছিল।সত্যিকারের ভালোবাসা কাকে বলে সেই রাতে আমি টের পেয়েছিলাম।
- আমি তখন একটুও ভাবতে পারি নাই যে কোনো প্রেমিকের মধ্যে একবিন্দু মিথ্যের আশ্রয় থাকতে পারে…।
- আমার মধ্যে কোন মিথ্যার আশ্রয় ছিল না। তুমিই আমাকে যেতে বাধ্য করেছিলে। আর তোমার আপ্রান চেষ্টাও আমাকে তোমার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করতে পারেনি হয়তো সেটাই ছিল আমার ভুল।কেউ যদি ভুল করে সেই ভুলের মাসুল তাকেই দিতে হয়।সত্যিকারের ভালোবাসার ভেতর কেমন অস্থিরতা মিশে থাকে সেদিন বুঝেছিলাম।সত্যিকারের ভালোবাসা এমনই স্থিরতাকে মানে। শুধু আমি একা নই, তুমিও আমার জন্য কেমন উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলে, আমিও তোমার জন্য। একটুও বিরহ আমাদের সহ্য হয়নি। সেদিন আমাদের দুজনার মধ্যে কথা হয়েছিল, আমরা আমাদের প্রেম-দুঃখের অবসান ঘটাবো এক মধুর মিলনে। আর তাই আমরা এক অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার নিয়তিকে মেনে নিয়েছিলাম সামান্য বিরহকে স্বীকার করে নিয়ে। তুমি আমার স্বেচ্ছানির্বাসনের অন্তরায়ের ভেতর আমার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেছিলে — আমরা এক মধুর মিলনের অপেক্ষায় থাকবো। কিন্তু তুমি তোমার কথা রাখোনি। শেক্সপিয়র বলেছেন, জীবন কোনো আপ্তবাক্য নয়, জীবন সত্যেরই অঙ্গীভূত। ভালোবাসা হচ্ছে মানব-মানবীর আত্মত্যাগের প্রতিযোগিতা।’পৃথিবীর কাছে তুমি কেবল একজন নারী কিংবা পুরুষ কিন্তু ভালোবাসার মানুষটির কাছে তুমিই যে তার গোটা পৃথিবী। ‘কিংবা ‘ভালোবাসা যুদ্ধের মতোই শুরুটা বেশ সোজা কিন্তু শেষটা বড্ড কঠিন।’
সম্পর্কের সিঁড়ি বেয়ে, ভালোবাসার মহাপ্লাবনের সূত্র ধরে নিজের অস্তিত্ব অটুট রাখার জন্য অনেক লড়াই করেছি। আগের চেয়ে প্রয়োজনের ব্যাপকতা বর্তমানে একটু বেশি। অনেক ঝড়-তুফান বাধা-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে স্বার্থের কথা ভেবেই সর্বাঙ্গীনভাবে নিজেকে তুলে ধরবো আশ্রয় নামক বিচিত্র বিলাস ভবনে। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করেই নিজেকে একটু লোভী তৈরি করি। কারণ নানাবিধ। তবে এ পৃথিবীতে শিশু না কাঁদলে মা’ও দুধ দেয় না। কেড়ে নেয়ার প্রবণতা ইদানীংকালের। সরলতা, সুখের মিষ্টি ইনোসেন্ট ভাব এগুলোই কাল। নিজেকে নতুন ছাঁচে ফেলে নতুন ঢঙ্গে রাঙাবো। দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা কিছুটা আড়াল।
দিনরাত কেটে যায় অপ্রত্যাশিত লজ্জাহীন নারীর মতো। আবেগকে বন্দী করলাম কর্মের চত্বরে। অফিসে কাজের ব্যস্ততায় নিজকে ডুবিয়ে রাখা। অফিস আর বাসা, অবসরের সময় লেপটপ নিয়ে কাটানো এখন নিয়মে পরিনত হয়েছে। মানুষের চরিত্র স্খলনের বহুবিধ উদাহরণ চোখে জ্বল জ্বল করে। ভাবনার শিরা উপশিরা অকেজো মেশিন এখন দম বন্ধ হয়ে যাবার পালা। বোধকে হত্যা করার দীর্ঘ প্রয়াস চালিয়েছি। আতল দংশনে কারাগারে বন্দী থেকেছি। তবুও সংকল্প এখনো একাকী প্রতীক্ষায় অনড়। অথচ তুমি স্বর্গভ্রষ্ট দুরারোগ্য বুদ্ধির কবলে। হাওয়ায় হাওয়ায় অনেক খবর ভাসে। ভাসে ভবিষ্যতের ডিঙ্গি। হৃদয়ের চর্ব চোষ্য লুণ্ঠিত। সামাজিক অবস্খান খুব দুর্বল। অপমানের আঁচড়ে মাংসপিণ্ড খসে পড়ছে একেক করে। তবুও তুমি সর্বস্ত ভেবেই আজন্ম উপোসী। খুঁজে নেব তোমায় যুগান্তরের ঘূর্ণি চক্রে। অকস্মাৎ সাগরের গহীনে চিরদিনের চির হাহাকারের তৃপ্ত পূর্ণতায়। অতিচেনা পদশব্দে খুলে দেব স্বপ্নের দরজা জানালা। নীরবে নিত্য অকুণ্ঠ আবেগে সুনিশ্চিত ভালবাসার দাবিতে।
ভাবনার চক্করে ভেসে কখন যে কাকডাকা ভোর হয়ে এলো তা বুঝতেই পারেনি। আমার অস্তিত্বে তোমার বিলীন ঘটিয়ে চোখের আড়াল হয়তো হয়েছো, মনের আড়ালতো হওনি। অবশ্য কথায় বলে Out of sight out of mind. সত্যি কি তাই! পেরেছো কী আমার একেকটা স্পর্শের মৃত্যু ঘটাতে? পারবে কি লেপ্টে থাকা তোমার শরীরে আমার নি:শ্বাসের মৃদু মাদলের রিনি-ঝিনি বন্ধ করতে? উপস্খিতির মূল্য এতটাই অপারজেয়, কীসের তৈরি তুমি? না পাওয়ার হাহাকারে যে শূন্যতার সৃষ্টি, হৃদয়ের সরোবরে কতটুকু ঠেলে নিয়ে যাবে তা কে জানে।আর পারছি না।
পৃথিবীতে পরম প্রাপ্তি বলে কিছু নেই। সে জন্যে জীবন মানে এক ধরনের দু:খ বিলাসিতা। জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতা নিজ কর্মের দক্ষতা অদক্ষতা সবকিছুই নিজের পিঠে বহন করতে হয়।চিন্তা করে কি আর লাভ। বুদ্ধিমত্তা নিয়েই চলতে হবে আসন্ন দিনগুলোর জন্যে।তবুও শীত আসবে আবার শীতের পর বসন্ত।বসন্তের মরা নদীতে আবার জোয়ারের বান আসবেই। ফলে ফুলে ভরে উঠবে হয়তো কোন অনাবাদী জমি। এ আর এমন নতুন কি? তারপরও জীবন তার নিয়মের স্রোতেই চলবে। এরপরও হৃদয়ের শূন্য কুঠরীতে বেজে উঠে প্রিয়জন হারানোর বিরহী সুর………..
“তুমি ফিরাবে কি শূন্য হাতে আমারে ? প্রিয় হে প্রিয়..
যে তোমারে দিল যে প্রান, দিল প্রেম দিল এত গান।
কিছু কি দেবার নাই তারে…?
তুমি যত ব্যথা দিয়েছোও নিঠুর
মোর কাছে সবই যে মধুর
তুমি ফিরালেও তাই ফিরে আসি
বারে বারে তব দ্বারে…….”
ছয়….
“যেখানেই থাক ভাল থাক তুমি সুখেই থাক
পুরানো দিনের কথা ভেবে ভুল করোও নাকো।
কবে কোন ফুল দিয়েছি তোমায়,
কখন শুকিয়ে গেছে সে হাওয়ায়
তাকে কেন আর বয়ে পাতায় মোরে রাখ” ?
কামনাবিহীন ভালোবাসার কথা উঠলেই আমার রাজলক্ষী ও শ্রীকান্তর ভালোবাসার কথা মনে পড়ে। আর চারুচন্দ্র আধারকারকেও ভুলিনি, ভালোবেসে, কেঁদে জীবনকে চোখের জলে ভাসিয়ে একদনি হারিয়ে গেল।চারুচন্দ্র আধারকার তার বন্ধুর স্ত্রী পরমাকে ভালোবেসেছিল। অবিবাহিত এক পুরুষ পর স্ত্রীর প্রেমে পাগল হয়ে জীবনে এক ঝড় নিয়ে এলো।
গাইতে লাগলো:
“আমি তোমার প্রেমে হব সবার
কলংকভাগী। আমি সকল দাগে হব দাগী”।
পড়াশোনা-জানা ছেলে, কলংক সে করেনি শুধু নীরবে ভালোবেসে কল্পনা আর স্বপ্নরে সব জালবুনে জীবনের সব লেন-দেন পূরণ করে অন্য কোনো খাতায় নিজের নাম লিখে উধাও হয়ে গেল। পরমা একদিন তাঁকে বলেছিল, তুমি আমায় কোনদিন পাবেনা সেতো তুমি জান, তবু কেন ভালবাসো? চারুচন্দ্র বললো, পাবোনা বলেই তোমায় না ভালোবেসে থাকতে পারিনা। সব ভালোবাসায় দেহের একটা বড় ভূমিকা থাকে তবে চরমক্ষেত্রে দেহ আবেগের পেছনে স্থান নেয়। বড় বড় প্রেমের গল্পে এই সত্যটাই প্রধান।
ভালোবাসার রসায়ন খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়। হৃদয়, মন, দেহ সব কিছু এক করলে ভালোবাসার প্রাথমিক রূপটা দেখা দেয়। তারপর জীবন জন্ম নেয়। ভালোবাসার শক্তি অনেক। সে কালকে জয় করে। সে জীবনের নুতন মানে সামনে এনে দেয়। সে জীবনের গভীরে, মনের অতলান্তে বীজাণুর মত চুপ করে থাকে। সে দিনে-রাতে মনের হাত ধরে ছায়ার মত জীবনকে অনুসরণ করে। সে গানে, কবিতায়, গল্পে আর জীবনের সব পাতায় আসন পেতে বসে থাকে। ভালোবাসা হাসিতে, কান্নায়, নীরবতায় আঁচল পেতে চুপ করে থাকে। তার যে কত রূপ আর কত যে তার ভাব, তা যে ভালোবাসে সেই জানে। শ্রীকান্ত তাই বলেছিল, এতকাল যাহাকে কেন্দ্র করিয়া ঘুরিলাম, নাপাইলাম তাহার কাছে যাওয়ার অধিকার, না-পাইলাম দূরে যাওয়ার অনুমতি|তাইতো বিরহী আত্মার করুন সুর স্মৃতি হাতরে ফিরে..
“সে কেনো আমায় বুঝলনা আমি তাকে ভালবাসি এখনও
তার ব্যথা ভাবি মোর ব্যথা তার সুখে আমি হাসি এখনও
এত কাছে ছিল যে গো যে আমার এতটা আপন
সে আমায় জানলো দেখলো না আমার এ মন
চলে গেল শুধু রেখে গেল স্বপ্ন যে রাশি রাশি….”
ভালোবাসার টান যে কত গভীর আর সে ভালবাসা নিজের অস্তিত্ত্বকে কীভাবে চিরন্তন করে তোলে নদীর কাছ থেকে তা জেনেছিল সৈকত।
আপনাকে আমি কি বলে সম্বোধন করব ? পড়ার টেবিলে বসে হঠাৎ নদীর প্রশ্ন। এরকম একটি প্রশ্নের মুখেমিুখি হবে সৈকত কখনো ভাবেনি। কোন কিছু না ভেবেই বলল হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন ?
- না, এমনিই। আপনি তো আমার সম্পর্কে ভাই আবার আমার শিক্ষক। তাই বলছিলাম কি ভাই বলল না স্যার বলল ?
- তোমার যেটা বললে সুবিধা হবে সেটাই বলবে।
- আমার সুবিধা নামে ?
- হ্যা, তোমার সুবিধা। যেটা পড়ার সাথে সম্পর্কিত নয় সেই প্রশ্নটা না করলেই নয়। তাছাড়া তোমার মতলব কি বলো তো নদী। মেজো ভাইকে দিয়ে বলিয়ে তোমার শিক্ষক বানালে। প্রথম দিকে পড়াশোনার প্রতি যথেষ্ট যত্নবান, শিক্ষকের প্রতি ছাত্রছাত্রীর যে শ্রদ্ধাবোধ সেটা যথেষ্ট ছিল। ইদানিং দেখছি তুমি পড়াশোনার প্রতি কিছুটা উদাসীন। হোম ওয়ার্ক গুলি ঠিক মতো করছো না, করলেও ভুল হচ্ছে ব্যাপার কি আমাকে বল তো।
- না, তেমন কোন ব্যাপার নেই। ইদানিং আমার কিছু ভালো লাগে না। সব কাজেই কেন জানি ভুল হচ্ছে। কেন এরকম হচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না।
- তোমার কি শরীর খারাপ ? কেমন যেন তোমাকে উদাস মনে হয়।
- না, শরীর খারাপ নয়। মন খারাপ।
- মন খারাপ! তোমার তো মন খারাপের মতো কোন কারন দেখছি না। তোমার যে বয়স এ বয়সে তো মন খারাপ হওয়ার মতো ব্যথা পাওয়ার কথা নয়।
- কেন আমি ছোট বলে কি আমার মন খারাপ হতে পারে না। আমি কি কোন কিছু চাইতে পারি না ? আমার কি কোন আশা থাকতে পারে না ?
- আমি তো সেভাবে বলিনি। আমি বলতে চেয়েছে তোমার এখন সব সময় হাসি খুশি থাকা উচিত। সবার সাথে মন খুলে কথা বলা উচিত। ব্যথা সহ্য করার, ব্যথা ধারন করার বয়স এখনও হয়নি তোমার।
- আমি একটা কথা বলল জানিনা আপনি কি ভাবে নিবেন।
- বল কি কথা ?
- না, মানে।
- মানে মানে করছো কেন ?
- আপনি রাগ করবেন নাতো।
- না, বলো।
- আপনি কি আপাকে ভালবাসেন ?
- কেন ? তোমার এ রকম মনে হলো কেন ? এজন্যই কি তোমার মন খারাপ ?
- ঠিক তা নয়। তবে কিছুদিন যাবৎ দেখছি আপা সব সময় আপনাকে চোখে চোখে রাখে। আমাকে যখন পড়াতে আসেন আপা প্রায়ই বিভিন্ন অজুহাতে বারবার পড়ার ঘরে আসে। আপার পড়ার টেবিলে বসে আনমনে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাছাড়া সেদিন বলছিল আপাও নাকি আপনার কাছে পড়বে।
- মৌমিতা পড়বে তাতে তোমার তো অসুবিধা হবার কথা নয়। আমাকে ছোট ভাই একবার বলেছে আমার যদি সময় থাকে তবে যেন তোমার সাথে মৌমিতাকে পড়াই।
- আপনি কি বলেছেন ?
- আমি বলেছি যদি ঢাকা না যাই তবে পড়াব।
- ঢাকা যাবেন কেন ?
- কোচিং করতে । ভাল কলেজে ভর্তি হতে হলে কোচিং করতে হয়। তাই ঢাকা যেতে হবে।
- আপনি ঢাকা গেলে আমি পড়ব কার কাছে ?
- আমি ঢাকা গেলে কি তোমার পড়া বন্ধ থাকবে। যেখানে আমার মত শিক্ষক নেই তারা কি পড়ে না।
- না, আমি সে ভাবে বলিনি। বলছিলাম কি ঢাকা যাওয়ার দরকার নেই। আপনার রেজাল্ট বের হলে দেশের কলেজেই ভর্তি হবেন।
- কেন ? তুমি কি চাও না আমি ভাল কলেজে ভর্তি হয়ে ভাল রেজাল্ট করি।
- তা চাইব না কেন ? আপনি গ্রামের কলেজে ভর্তি হয়েও ভাল ফলাফল করতে পারবেন।
- তার মানে তুমি কি বলতে চাও ষ্পষ্ট করে বলো।
- না, মানে আপনাকে না দেখলে আমার ভাল লাগে না। আমি মনে হয় আপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি।
- তুমি তো আমার প্রতি নির্ভরশীলই। আমি তোমার শিক্ষক।
- শিক্ষক ছাত্রীর বাইরেও তো আমাদের একটা সম্পর্ক আছে। আমরা ভাই বোন।
- সেটা তো আমি অস্বীকার করি না। তাছাড়া তোমাদের পরিবারের সাথে আমাদের পরিবারের গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক যেটা সবাই জানে। আমার মাও তোমাকে যথেষ্ট আদর করে।
- সে সম্পর্কটাকে আরো গভীর করতে চাই।
- কিভাবে ?
- আপনাকে আমার ভালো লাগে। আমি আপনাকে ভালবাসি। আপনাকে ছাড়া আমি কোন কিছু কল্পনা করতে পারি না।
- কি বলছো তুমি ? মাথা ঠিক আছো তো ? তোমার এখনও ভালবাসার বয়স হয়নি। ভালবাসার অনেক সময় আছে তোমার সামনে। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। বাজে চিন্তা মাথায় থেকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের চিন্তা করো। নাও সব কিছু গুছিয়ে নাও আজ আর পড়তে হবে না।
আছরের আযান হচ্ছে। সৈকত পড়ার ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে হঠাৎ মৌমিতার ডাকে থেমে গেল, সৈকত ভাই নামাজ শেষে যাবার সময় বড় ভাবীর সাথে দেখা করে যাবেন।
সাত….
খেলিছ এ বিশ্বলয়ে বিরাটও শিশু আনমনে
প্রলয়ও সৃষ্টি তব পুতুলও খেলা নির্জনে।
পৃথিবীর যতো সৌন্দর্য সবতো মেয়েদের মধ্যেই ।কোন পুরুষই চায় না সেই সৌন্দর্য থেকে বঞ্চিত হতে। আমিও একজন পুরুষ আমিও পারিনি নিজকে সংবরন করতে। শরীরে পঙ্গুত্ব খুব সহজেই চোখে পরে। কিন্তু মনের পঙ্গুত্ব ভেতরে ভেতরে ভাঙ্গতে থাকে। সে ভাঙ্গনের দাগ চোখে পড়ে না, মন দিয়ে আবেগ দিয়ে অনুভব করতে হয়। এমন কোন কথা নেই যে, একজন ভালোবেসে যাবে বলে অন্যজনকেও ভালোবাসতে হবে। তবুও সকলের আশা দুজনের অনুভূতি যতোটা কাছে থেকে ভোগ করা যায় ততোটা মঙ্গল। ভালোবাসার মানে তো তাই। ও বলবে সে শুনবে, সে ভাববে ও বুঝবে। অপেক্ষা, আর অপেক্ষা ছাড়া ভালোবাসা মোটেও এগোয় না। ভালোবাসার চার নম্বর শর্ত; একটুকু ছোঁয়া ! চোখ হলো সুরঙ্গ পথ। মনের ভেতর যা কিছু বাসা বাঁধে তার বেশির ভাগ আসে চোখের খোলা দুয়ার দিয়ে।
নামাজ শেষে মৌমিতার কথা মনে পড়ে গেল।কিছুটা ভাবনাও হলো। বড় ভাবী কেন তার সাথে দেখা করতে বললো ? কিছুটা কৌতহল মিশ্রিত ভয় নিয়ে সৈকত বড় ভাবীর মুখোমুখি হয়। ভাবী সৈকতকে দেখে মুচকি একটা হাসি উপহার দিল। যেটা ভাবীর মুখে প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়। মুচকি হাসির সময় ভাবীর গালে টোল পড়ে, তাতে ভাবীর সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দেয়।কিন্ত আজকের হাসির ভিতর আলাদা একটা রহস্য লক্ষ্য করল সৈকত। ভাবী সৈকতের পূর্ব পরিচিত বিধায় ভাবীর কাছ থেকে আলাদা একটু আদরও পায়।তাছাড়া পৃথিবীতে কিছু কিছু নারীর মুখ দেখলে কামভাব না জেগে শ্রদ্ধাবোধ জেগে উঠে, মহান বিধাতা কিছু কিছু নারীকে শ্রদ্ধার পাত্রী করে গড়েছেন আবার কাউকে গড়েছেন কামনার পাত্রী হিসাবে। বড় ভাবীকে দেখলে তার কোমলমতী মুখ পানে তাকালে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। মানুষকে আপন করে নেবার একটা অসাধারন ক্ষমতা আছে তার মধ্যে।
ভাবী আমাকে দেখা করতে বলেছেন কেন ?
কেন ? আমি কি তোমাকে দেখা করতে বলতে পারি না ?
তা পারবেন না কেন ?
সচারাচর তো আমাকে দেখা করতে বলেন না। যা বলার আমাকে সরাসরি বলেন।
কিছু কথা থাকে যা সরাসরি বলা যায় না। তাছাড়া অন্যের কথা আমি কি ভাবে বলব ?
তার মানে ?
মানে অতি সোজা এই নাও। বলে একটি ছোট কাগজ আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। এটা কি ?
আমি কিভাবে বলব ? আমি কি দেখেছি ?
কে দিয়েছে ?
সেজ আপা আমাকে বলল তোমাকে দিতে।
সৈকত আর কোন কথা না বাড়িয়ে নিজ গন্তব্যে পা বাড়াল।
শীতের পড়ন্ত বিকেল। শান্ত নদীর নির্মল স্বচ্ছ জল। পশ্চিম আকাশে সূর্য দিনের আলো মিলিয়ে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়। সৈকত এসে দাড়াল তার চির পরিচিত নদীর ধারে।ভাবছে মৌমিতা কেন তাকে পত্র দিল ? কি লেখা আছে ? অনেক ভাবনার পর কাঁপা কাঁপা হাতে চোখের সামনে মেলে ধরল ছোট কাগজ খানি।
দাদা,
সংসারে কোনকিছুই চিরস্থায়ী হয় না। এমনকি প্রেমও না। বরং প্রথম যৌবনের প্রেমটাই সবচেয়ে ভঙ্গুর। পাবার অবিরাম প্রত্যশা একরাশ আশা নিয়ে আমার হৃদয় বানী আপনার পদতলে দেবার বাসনায় ক্ষুদ্র হৃদয়ের আকুতি। প্রাণের সখী চিরকালই চেয়ে থাকবে তার পথের দিকে। জানিনা এ পথের শেষ কোথায় ? তবুও গন্তব্যের প্রত্যাশী চির বিরহী আত্মা।জানি হৃদয় রানী হওয়ার যোগ্যতা নেই, তবে হৃদয় দাসী হতে আপত্তি নেই।প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির ব্যবধান ভাঙ্গার দায়িত্ব দেবতার।দেবতার তরে আমার প্রসাত চির পবিত্র চিত্রে সযতনে রাখা আছে দেবতার আহ্বানের অপেক্ষায়। নিশ্চয়ই দেবতা নিশার করবে না।
-প্রত্যাশার দেবী
“আমি চিরতরে দুরে চলে যাব
তবু আমারে দেব না ভুলিতে”।
আমাদের মরণশীল জীবনে প্রেম একটু অমৃতের ছোঁয়া, ক্ষণিকের জীবনে একটু শ্বাশত সংগীত। যাযাবর বলেছেন প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা আর প্রবঞ্চিতকে দেয় দাহ।সৈকত আর নদী দুজন দুজনকে কি দিয়েছিল, কেন ওদের ছাড়াছাড়ি হয়েছিল জানবো না কোনদিন। দু’টি মন কচি বয়সে কাছাকাছি এসেছিল কিন্তু একসাথে জীবন কাটাতে পারল না। এর জন্য কে দায়ী ? সৈকত নাকি নদী ? নাকি এ সমাজ ? সৈকত তো ভালবাসা নামক ক্ষনিকের মোহকে পাশ কাটিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্ত নদী তাকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়েছিল ভালবাসার জালে।সৈকত নিজের মেধা দিয়ে দক্ষতা দিয়ে দারিদ্রকে জয় করতে চেয়েছিল কিন্ত পেরেছিল কি ? না পারার পিছনে কি কারন ছিল ? এর কোন উত্তর কি পাবো কোনদিন ? কে দেবে এর উত্তর ? এতসব প্রশ্নের মাঝে হৃদয় ভাঙ্গার বেদনার সুর কেবলি যাতনা দেয়। ভাঙ্গা হৃদয় কেবলি প্রশ্ন তুলে গভীর নিশিতে কে যেন জাগিয়ে রাখে না পাওয়ার বেদনায় সুর তুলে ভগ্ন হৃদয় বীনার তারে…….
গভীর নিশিতে ঘুম ভেংগে যায় কে যেন আমারে ডাকে
সেকি তুমি ?
কার স্মৃতি বুকে পাষানের মতো ভার হয়ে যেন থাকে
সেকি তুমি ?
মনে হলো, আদিকালের সব নিয়ম, নিয়তি তাঁর পদতলে হাতজোড় করেবসে আছে। চির পরিচিত নদীর ধারে বসে আকাশ ভরা গ্রহ-তারায় জীবনের মানে খুঁজতে লাগলাম। মনে হলো,আজ যদি আমি নদীকে না জানতাম তা হলে বুঝি জীবনের কোনো মানেই জানা হতোনা। পড়ন্ত বিকেলে গোধূলী লগ্নে যখনি নদীর কথা ভাবি, মৌমিতার অবুঝ প্রেমকে না বুঝার ভান করে পাশ কাটিয়ে যাই তখন জীবনানন্দ দাশের এই কবিতাটি মনে পড়ে
‘হে পাবক অনন্তনক্ষত্র বীথি তুমি, অন্ধকারে
তোমার পবিত্র অগ্নির জলে।
অমাময়ি নিশি যদি সৃজনের শেষ কথা হয়,
আর তার প্রতিবিম্ব হয় যদি মানব হৃদয়,
তবুও আমার জ্যেতি সৃষ্টির নিবিড় মনোবলে
জ্ব’লে উঠে সময়ের আকাশের পৃথিবীর মনে;
বুঝেছি ভোরের বেলা রোদে নীলিমায়,
আঁধার আরব রাতে অগণন জ্যোতিষ্কশিখায়;
মহাবিশ্ব একদিন তমিস্রার মত হয়ে গেলে
মুখে যা বলোনি, নারি, মনে যা ভেবেছো তার প্রতি
লক্ষ্য রেখে অন্ধকার শক্তি অগ্নির সুবর্ণের মতে
দেহ হবে মন হবে তুমি হবে সে-সবের জ্যোতি।
প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতা, নম্রতাকে না-পাওয়ার যাতনা আর বহুসংখ্যক সদস্যবিশিষ্ট নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সন্তানের কঠোর পরিশ্রম আর বিত্তবান হওয়ার কঠোর সংগ্রামের এই নিরলস জীবনে এতটুকু মিষ্টতার যোজন ছিলোনা। কত দিন অফিসের টেবিলে মাথা নিচু করে
ডুকরে কেঁদে ওঠেছে এই শুষ্ক জীবন-যাপনের দিন তোমার কথা ভেবে। আশ্রয় খুঁজেছে সাহিত্যের আখড়ে। বাইরে কন্টকময় প্রকৃতি, অচেনা মানুষের ঢল আর এই সব বৈরিতার মাঝে যেন ফুলেল সুবাস ষোল বছরের মেয়ে পূর্ণ যৌবনপ্রাপ্ত বিংশবর্ষীয় নারী। আট বছর বড় দীর্ঘ সময় যৌবনে। জোয়ার কেটে গেলে খরস্রোতা নদীরও ধার থাকে না। স্বপ্নের মানুষটা স্মৃতির সীমানাতে চলে যায়। আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায় হৃদয় স্রোতে। সেখানে স্থান নেয় নতুন স্মৃতি এটাই নিয়ম।
আট………..
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ জীবনযাপন ছাড়া একাকী জীবন কারো কাম্য নয়। আবার পরিচিত সমাজের বাইরেও মানুষের পক্ষে চলা খুবই কঠিন।সমাজবদ্ধ কোনো মানুষই সামাজিক বিপর্যয় কামনা করতে পারে না।মানুষ সব সময় সুখ ও শান্তি চায়।শান্তি মানুষের আরাধ্য বিষয়।কিন্তু এ সুখ-শান্তি নির্ভর করে সমাজবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর।উঁচু-নীচু, ধনী-দরিদ্র এসব পার্থক্য আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।আল্লাহর সৃষ্টির উদ্দের্শ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। কিন্তু সামাজের কিছু মানুষ সৃষ্টির এই ধারাবাহিকতা রক্ষার নামে মানুষের মধ্যে বিভাজনের এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরী করে তাদের শোষন-নির্যাতনের কাজ করে যাচ্ছে।কোনটা ভালো কোনটা মন্দ এবং এই ভালোমন্দের ভিত্তিতে উচিত-অনুচিত কর্মকান্ড কি হবে বা হবে না, সে সব সম্পর্কে সবারই একটা স্পষ্ট বা মোটামুটি ধারনা আছে।অনেকে সেটাকে নৈতিকতা বা নীতিজ্ঞান বলে মনে করেন।কিন্তু আমাদের ব্যক্তি জীবনে বা দৈনন্দিন জীবনের জটিল কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে, উচু-নীচু, ভালোমন্দের মধ্যেকার বিভাজনজ্ঞাপক দাগ গুলি সরল নয়, মাঝে মাঝে মনে হয় এই পৃথকীকরন দাগগুলি আছে কিনা সেটা বের করাও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। অনেক সময় সমাজে ও ব্যক্তিজীবনে কতগুলি দুর্দমনীয় প্রভাব মানুষকে বিভ্রান্ত করে।সৈকতও বিভ্রান্ত হয়, আহত হয়, আশাহত হয় নদীর পিতার ব্যবহারে।
প্রত্যেকটি মানুষেরই কি ভিতর এবং বাহিরের দুটি রূপ সর্বদা ক্রিয়াশীল ? নাকি এটা তাদের অভিনয় ? মানুষের ভিতরের এবং বাহিরের এই যে, দুই ধরনের রূপ এটা সহজাত নাকি স্বভাবজাত ? একজন মানুষ কিভাবে ভেতরে বাহিরে দুটি রূপ ধারন করতে পারে সেটা দবির উদ্দিন কে না দেখলে বুঝতে পারত না সৈকত।
লেখক: সৌদি প্রবাসী। ইরকা মিডেলইষ্ট প্রেট্রোলিয়াম পাওয়ার এন্ড প্রেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানীতে কর্মরত।



“কাঁদালে তুমি মোরে। ভালোবাসারই ঘায়ে


নিবিড় বেদনাতে”।
পুরো গল্পটাই ভিন্ন আমেজে ভিন্ন ধাছের
এই রোদ এই বৃষ্টির মত
এই গল্প এই কাব্য – আবার এই স্বপ্ন এই স্মৃতি
চমৎকার
শুভ সকাল
অসংখ্য ধন্যবাদ কষ্ট করে পড়ে মন্তব্য করার জন্য।