অবমাননাকর গৃহকর্মীর পেশায় নয়, অন্য পেশায় রফতানি করা হোক নারী জনশক্তি

সৌদি আরব প্রতি মাসে বাংলাদেশ থেকে ১০ হাজার মহিলা গৃহকর্মী নেবে বলে গতকাল ৫ এপ্রিল ২০১১ তারিখে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ, শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন (দৈনিক সমকাল, ৬ এপ্রিল ২০১১)। তিনি আরও বলেছেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীদের প্রশিক্ষিত গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে প্রেরণের প্রক্রিয়া শুরু হবে। সাম্প্রতিককালে জনশক্তি রফতানিতে ব্যাপক ভাটা পড়ার প্রেক্ষিতে এ খাতে সরকারের এটি একটি বড় অগ্রগতি–মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে এমনটিই মনে হয়েছে। অন্যদিকে কেউ কেউ এটিকে খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক সৌদি আরব সফরের ফল বলে মনে করছে।

জনশক্তি রফতানি নিঃসন্দেহে জাতীয় অর্থনীতির একটি অগ্রাধিকার খাত, যা থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়ে থাকে। তাই বিভিন্ন পেশায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বিদেশে প্রেরণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। কিন্তু গৃহকর্মী হিসেবে নারীদের বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি নানা কারণে কেবল নারীদের জন্যই অবমাননাকর নয়, বরং দেশের জন্যও অসম্মানজনক। এ ব্যাপারে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আরও চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

মধ্যপ্রাচ্যের ধনাঢ্য আরব দেশগুলি বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ইথিওপিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নারী গৃহকর্মী নিয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব নারীরা তাদের চাকুরিদাতা গৃহকর্তা বা পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যের বিকৃত লালসা ও অবৈধ যৌনাচারের শিকার হয়। দেশে সহায়-সম্বল বিক্রি করে, পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্দেশ্যে বিদেশে পাড়ি দেওয়া এসব অসহায়, দরিদ্র নারীরা তাদের এই যৌন ও দৈহিক নির্যাতনের কথা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রকাশ করতে পারে না অথবা প্রকাশ করার সুযোগ পায় না। এরপরও মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী নির্যাতনের অসংখ্য খবর ছড়িয়ে আছে অনলাইন সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়। সম্প্রতি সৌদি সাময়িকী ‘সাইয়্যিদাতী’ কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, আরব বিশ্বে আনুমানিক তিন মিলিয়ন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে (আল আরাবিয়া, ২০ জানুয়ারি ২০১১)। বলাই বাহুল্য, এসব গৃহকর্মীর বেশির ভাগই বিদেশি।

একসময় সৌদি আরবে থাকার এবং সৌদিদের সাথে কথা বলার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকেও জানি, অনেক অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও ধর্মান্ধ, তবে ধনাঢ্য সৌদিই বেতনভূক নারী গৃহকর্মীদের নিতান্ত ক্রীতদাসী মনে করে এবং তাদের ওপর উপগত হওয়াকে ধর্মীয় দৃষ্টিতে বৈধ বলে মনে করে। অবশ্য সুশিক্ষিত, হৃদয়বান ও প্রকৃত ধর্মপ্রাণ সৌদিরা এর ব্যতিক্রম। তবে তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয় বলেই মনে হয়েছে।

সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশি নারীদের ভয়ংকর যৌন ও দৈহিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও, ২০০৫ সালে এ কারণে সে দেশে গৃহকর্মী হিসেবে নিযুক্ত মহিলা আনসার সদস্যদের দেশে ফেরার কথা আমরা জানি (ডেইলি স্টার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৫)। এমনকি সৌদি চাকুরিদাতা কর্তৃক তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার অভিযোগও তখন শোনা গিয়েছিল। এ ছাড়া বিনা পারিশ্রমিকে ও অল্প পারিশ্রমিকে কাজ করানোর অভিযোগ তো আছেই। এক ফিলিপিনো ও এক শ্রীলংকান নারীকে সৌদি আরবে আটকে রেখে বছর পর বছর বিনা বেতনে ঘরের কাজ করানোর খবর দেখুন যথাক্রমে এখানেএখানে। অথচ আরব দেশগুলির মানবাধিকার পরিস্থিতি ও বিচার ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি কর্মীদের অনুকূল নয়।

এসব কারণে ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকাসহ কয়েকটি দেশ মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী হিসেবে নারী জনশক্তি রফতানি হ্রাস করেছে (অ্যারাব নিউজ, ১১ আগস্ট ২০০৮২২ ফেব্রুয়ারি ২০১১)। সম্ভবত এ কারণেই সৌদি আরব এখন বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মী নিতে চাইছে এবং এজন্য আমরা উল্লসিত বোধ করছি! আমাদের নারীরা পেটের দায়ে বিদেশে গিয়ে যৌনদাসী হবে–এটি কি জাতি হিসেবে আমাদের কাছে সম্মানজনক কিংবা গ্রহণযোগ্য?

তাই নারীর সম্মান ও দেশের ভাবমূর্তির কথা চিন্তা করে সরকারের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি পূনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছি। তবে নারীদের জন্য উপযুক্ত অন্যান্য পেশায় তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানো যেতে পারে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে এগিয়ে আসবে কে বা কারা?

আমার ব্লগ দেখুন

VN:R_U [1.9.7_1111]
রেটিং করুন:
Rating: 3.8/5 (4 votes cast)
VN:F [1.9.7_1111]
Rating: 0 (from 0 votes)
অবমাননাকর গৃহকর্মীর পেশায় নয়, অন্য পেশায় রফতানি করা হোক নারী জনশক্তি, 3.8 out of 5 based on 4 ratings

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের, লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর। শব্দনীড় ব্লগ কোন লেখা ও মন্তব্যের অনুমোদন বা অননুমোদন করে না।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

২১ টি মন্তব্য (লেখকের ১০টি) | ১১ জন মন্তব্যকারী

  1. ২২শিকদার : ০৬-০৪-২০১১ | ২১:১২ |

    আমাগো দেশের নারীরা কবে থাইক্কা সম্মানীয় পেশা লইয়া বৈদেশ গমন করিবে তাহা ভাবতাছি। সরকার ও বিএনপি ইহাতে আনন্দ করতাছে তাহা দেখিয়া দুঃখিত হইলুম। কোন লিংকু পড়ি নাইক্কা। তয় পোস্ট পড়িয়াছি। আপনেরে ধন্যযোগ।

  2. রকি : ০৬-০৪-২০১১ | ২২:৩০ |

    এ বিষয়ে গণমাধ্যমসহ অন্যান্য মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে এগিয়ে আসবে কে বা কারা? Think Think

    • নেটপোকা : ০৬-০৪-২০১১ | ২২:৩৮ |

      আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমার এই পোস্টটি দেওয়ার উদ্দেশ্যও ছিল সেটিই। তবে মূল দায়িত্ব সরকারের ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার। আর গণমাধ্যমের ভূমিকা তো অনস্বীকার্য। ধন্যবাদ।

  3. জ.ই মানিক : ০৬-০৪-২০১১ | ২২:৫১ |

    সহমত।
    জাতির বিবেক কুম্ভকর্ণ ঘুমায় পড়ে পড়ে।Frown
    জাগতে হবে,জাগাতে হবে।
    সাধুবাদ,সময়ের বাস্তবতার বিষয়টাকে চমত্কারভাবে উপস্থাপন করার জন্য।

    • নেটপোকা : ০৬-০৪-২০১১ | ২৩:৩০ |

      সহমত জানানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। আর লেখার প্রশংসা করার জন্য অশেষ কৃতজ্ঞতা। ভাল থাকুন।

  4. সজল শর্মা : ০৬-০৪-২০১১ | ২৩:০২ |

    ইউরোপীয় দেশ হলে অন্তত ৭০% নিশ্চিন্ত থাকা যেত যে সম্মানের সাথেই কাজ করবে তারা। কিন্তু সৌদী তো মার্কামারা। ক্রিতদাসীর সাথে মিলিত হওয়াকে রেওয়াজ হিসেবেই নেয় তারা। তাদের প্রাচীন ইতিহাসে বিয়ে না করেই ক্রিতদাসীর সাথে মিলিত হওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা ছিল। একে ধর্ম বৈধতা দেওয়ায় এখনও তারা একে বৈধ মনে করে। যদিও সৌদীর আইন একে স্বীকৃতি দেয় না, কিন্তু সমাজে বলতে গেলে স্বীকৃত। আর বিচার প্রার্থী হতে হলে নাকি চারজন পুরুষ সাক্ষী লাগে, সেটা তো একজন শ্রমিক নারী পায় না। এইকারণেই নাকি বিচার দিতেও পারে না। এমনিতেই বাংলাদেশীদের মিসকিন বলে। এখন থেকে তো ওরা ক্রিতদাসীর পয়দায়িশ বলা শুরু করবে। আর কয়েক বছর পরে যদি দাবি তুলে সব বাংলাদেশী ওদের বীর্যের ফসল তাতে অনেকে সুখ পেলেও বেশির ভাগ মানুষেরই মাথা হেট হবে।

    লিংকে যাই নাই। তবে দূর্দশার কথা অনেক আগেই পড়েছিলাম ব্লগে।
    http://prothom-aloblog.com/posts/16/39278

    • নেটপোকা : ০৬-০৪-২০১১ | ২৩:৩৫ |

      আসলে আমাদের মত দরিদ্র রাষ্ট্রের আর কীইবা করার আছে, বলুন? আপনার সুচিন্তিত মন্তব্য ও লিংকের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

  5. মুরুব্বী : ০৬-০৪-২০১১ | ২৩:১২ |

    নারীদের জন্য উপযুক্ত অন্যান্য পেশায় তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানো যেতে পারে।
    এ ক্ষেত্রে আমি সহমত। ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় নেটপোকা।

    • নেটপোকা : ০৬-০৪-২০১১ | ২৩:৩৬ |

      লেখাটি পড়ে সহমত জানানোর জন্য অশেষ ধন্যবাদ আপনাকে। শুভকামনা রইল।

  6. আ,শ,ম,এরশাদ : ০৬-০৪-২০১১ | ২৩:৪৮ |

    সহমত ।
    ধন্যবাদ।

    • নেটপোকা : ০৭-০৪-২০১১ | ৮:০২ |

      পড়ার জন্য এবং সহমত জানানোর জন্য আপনাকেও ধন্যবাদ। ভাল থাকুন।

  7. অন্তিম : ০৭-০৪-২০১১ | ০:৪৯ |

    অনেকদিন আগে এ বিষয়ে একটি পোষ্ট পড়েছিলাম। যা তখনই আমাকে অনেক ভাবিয়েছে। তবে আমাদের দারিদ্রতাই জন্যই এ সুযোগ পাচ্ছে বিদেশীরা।

    তবে সরকারের এ বিষয়ে উদ্যেগ গ্রহন করা উচিত। যদিও আমি সরকারের উপর আস্হা রাখতে পারি না—- Grin

    মিডিয়া একটি খুব ভাল ভূমিকা রাখতে পারে!

    • নেটপোকা : ০৭-০৪-২০১১ | ৮:০৫ |

      আপনার কথার সাথে একমত। আর এ বিষয়ে জন-সচেতনতা তৈরিতে মিডিয়ার ভূমিকা তো সবচেয়ে বেশি। ধন্যবাদ।

  8. শামান সাত্ত্বিক : ০৭-০৪-২০১১ | ৪:৪১ |

    হুম, আমাদের নারীদের নিয়ন্ত্রণ, তাদের হাতেই থাকা উচিত।

    • নেটপোকা : ০৭-০৪-২০১১ | ৮:১০ |

      সহমত পোষণ করার জন্য ধন্যবাদ।

    • নেটপোকা : ১০-০৪-২০১১ | ৯:২০ |

      আপনাকে ধন্যবাদ।