
বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস-০১:
বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস-০২:
চর্যাপদের কয়েকজন কবি ও তাঁদের চর্যাপদের নমুনাঃ
কাহ্ন পাঃ
চর্যাপদের কবিগণদের মধ্যে সর্বাধিক পদরচয়িতার গৌরবের অধিকারী কাহ্ন পা। তাঁর তেরটি পদ চর্যাপদ গ্রন্থে গৃহীত হয়েছে। এই সংখ্যাধিক্যের জন্য তাঁকে কবি ও সিদ্ধাচার্যদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করা হয়। কানু পা, কৃষ্ণপাদ ইত্যাদি নামেও তিনি পরিচিত। খ্রিস্টিয় অষ্টম শতকে কানু পার আবির্ভাব হয়েছিল বলে ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন। কাহ্ন পার বাড়ি ছিল উড়িষ্যায় এবং তিনি সোমপুর বিহারে বাস করতেন।
কাহ্ন পা রচিত একটি চর্যাপদের নমুনাঃ
এবংকার দৃঢ় বাখোড় মোড়িউ।
বিবিহ বিয়াপক বান্ধণ তোড়িউ।।
কাহ্ন বিলসঅ আসব মাতা।
সহজ নলিনীবণ পইসি নিবিতা।।
জিম জিম করিণা করিণিরে রিসঅ।
তিম তিম তথতা মঅগল বরিসঅ।।
ছড়গই সঅল সহাবে সুধ।
ভাবাভাব বলাগ ন ছুধ।।
দশবর রঅণ হরিঅ দশ দিসেঁ।
বিদ্যাকরি দম জা অহিলেসেঁ।।
আধুনিক বাংলাঃ এবংকার দৃঢ় বন্ধনস্তম্ভ মথিত করে, বিবিধ ব্যাপক বন্ধন ভেঙে ফেলে আসবমত্ত কানু বিলাস করে। সে শান্ত হয়ে সহজ নলিনীবনে প্রবেশ করে। হস্তী যেমন হস্তিনীতে আসক্ত হয় তেমনি মদকল তথতা বর্ষণ করে। ষড়গতি সকল স্বভাবে শুদ্ধ। ভাবে ও অভাবে এক চুলও ক্ষুব্ধ হয় না। দশদিকে দশবল রত্ন আহরণ করে বিদ্যারুপে হস্তীকে অক্লেশে দমন কর।
ভুসুকু পাঃ
চর্যাপদ রচনায় সংখ্যাধিক্যে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হলেন ভুসুকু পা। তাঁর রচিত আটটি পদ চর্যাপদ গ্রন্থে গৃহীত হয়েছে। ভুসুকু নামটিকে ছদ্মনাম হিসেবে মনে করা হয়। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল শান্তিদেব। তিনি সৌরাষ্ট্রের রাজপুত্র ছিলেন এবং শেষ জীবনে নালন্দায় বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। সেজন্য ভুক্তির ভু, সুপ্তির সু এবং কুটিরের কু- এই তিন আদ্যক্ষর যোগে তাঁকে ভুসুকু বলে পরিহাস করা হত। শান্তিদেব ভুসুকু সাত শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বর্তমান ছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
ভুসুকু পা রচিত চর্যাপদের নমুনাঃ
কাহৈরি ঘিনি মেলি অচ্ছহু কীস।
বেটিল ডাক পড়অ চৌদীস।।
আপণা মাংসে হরিণা বৈরী।
খনহ ন ছাড়অ ভুসুকু আহেরী।।
তিণ চ্ছুপই হরিণা পিবই ন পাণী।
হরিণা হরিণির নিলঅ ণ জানী।।
হরিণী বোলঅ সুণ হরিআ তো।
এ বণ চ্ছাড়ী হোন্ত ভান্তো।।
তরসঁন্তে হরিণার খুর ণ দীসঅ।
ভুসুকু ভণই মুঢ়া হিঅহি ণব পইসঈ।।
আধুনিক বাংলাঃ কাকে নিয়ে কাকে ছেড়ে কেমন করে আছি। চারপাশ ঘিরে হাঁক পড়ে। আপন মাংসের জন্যই হরিণ শত্রু। এক মুহূর্তের জন্যও শিকারি ভুসুকু ছাড়ে না। হরিণ ঘাসও ছোঁয় না, জলও পান করে না। হরিণ হরিণীর নিলয় জানা যায় না। হরিণী বলে- হরিণ তুমি শোনো, এ বন ছেড়ে চলে যাও। লাফ দেওয়ার জন্য হরিণের খুর দেখা যায় না। ভুসুকু বলেন- এ তত্ত্ব মূঢ় ব্যক্তির হৃদয়ে প্রবেশ করে না।
লুই পাঃ
সাধারণত লুই পাকে আদি সিদ্ধাচার্য বিবেচনা করা হয়। কিন্তু ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাঁকে প্রথম বলে স্বীকার করেন না। লুই পাকে বাঙালি বলে অনুমান করা হয়। উড়িষ্যায় তাঁর জন্মস্থান বলে কারও কারও ধারণা। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ উল্লেখ করেছেন, তারানাথের মতে লুই বাংলাদেশের গঙ্গার ধারে বাস করতেন। তিনি প্রথম জীবনে উদ্যানের(সোয়াতের) রাজার কায়স্থ বা লেখক ছিলেন। তখন তাঁর নাম ছিল সামন্ত শুভ। লুইপার জীবৎকাল ৭৩০-৮১০ খ্রিস্টাব্দ। সংস্কৃত ভাষায় তিনি চারটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তাঁর একটি গ্রন্থের নাম ‘অভিসময়বিভঙ্গ’।
চর্যাপদের প্রথম কবিতা লুইপার লেখা ছিল। কবিতাটি নিম্নরূপঃ
কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল।।
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ।।
সঅল সহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই।।
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাঠের আস।
সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস।।
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিত্তি বইঠা।।
আধুনিক বাংলাঃ শ্রেষ্ঠ তরু এই শরীর, পাঁচটি তার ডাল। চঞ্চল চিত্তে কাল প্রবেশ করে। চিত্তকে দৃঢ় করে মহাসুখ পরিমাণ কর। লুই বলেন, গুরুকে শুধিয়ে জেনে নাও। কেন করা হয় সমস্ত সমাধি? সুখে দুঃখে সে নিশ্চিত মারা যায়। ছলবন্ধ কপট ইন্দ্রিয়ের আশা পরিত্যাগ কর। শূন্যতা পক্ষে ভিড়ে পার্শ্বে নাও। লুই বলেন, আমি ধমন চমন দুই পিঁড়িতে বসে ধ্যানে দেখেছি।
চর্যাপদের রচনাকালঃ
চর্যাপদের সঠিক রচনাকাল সম্পর্কে পণ্ডিতেরা মতৈক্যে পৌঁছতে পারেন নি। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের রচনাকাল ধরেছেন ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে। অন্যদিকে ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে চর্যাপদের রচনাকাল মনে করেন।
চর্যাপদের ভাষাঃ
চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা। ভাষার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তখন পর্যন্ত বাংলা ভাষা স্বকীয় মূর্তি সম্পূর্ণ রূপে পরিগ্রহ করতে পারে নি। এই অপরিণত ভাষাতেই চর্যাপদের কবিগণ ধর্মতত্ত্ব প্রতিফলনে সচেষ্ট হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, উড়িষ্যা, বিহার, আসাম, পশ্চিম বঙ্গ ও বাংলাদেশে নিজ নিজ ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে চর্যাপদ বিবেচিত এবং ভাষা-সাহিত্যের পাঠ্য-সূচিভুক্ত।
চর্যায় নাসিক্যধ্বনির প্রাধান্য ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে কেউ কেউ এ ভাষাকে পশ্চিমবঙ্গের মনে করেন। কিন্তু ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে চর্যার ভাষাকে প্রাচীন বাংলা কিংবা প্রাচীন বঙ্গকামরূপী ভাষা বলাই সঙ্গত।
সন্ধ্যাভাষাঃ চর্যাপদের ভাষাকে কেউ কেউ সন্ধ্যাভাষা বা সন্ধাভাষা বলেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এ ভাষা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ‘আলো আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায় আবার খানিকটা বুঝা যায় না। যাঁহারা সাধন-ভজন করেন, তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই।’- এ কারণে চর্যার ভাষা সন্ধ্যাভাষা। কারও মতে ‘সন্ধ্যাদেশ’ নামে বিশেষ অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে চর্যাপদের ভাষার মিল আছে বলে এ নাম হয়েছে।
তন্ত্রের সাধনা ছিল অনেকাংশে গূঢ় বা গোপন। এ সাধনা যাতে সাধারণ লোকের হাতে পড়ে বিকৃত না হতে পারে সে জন্য সন্ধ্যাভাষার ব্যবহার হত। চর্যাপদে এ উদ্দেশ্যেই পারিভাষিক শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। চর্যার অনেক বর্ণনা আক্ষরিক ভাবে এক অর্থ, আবার যোগসাধনার দিক থেকে ভিন্ন অর্থ। যেমন- ১১নং চর্যায়ঃ
মারি সাসু ননন্দ ঘরে সালী।
মাঅ মারি কাহ্ন ভইঅ কবালী।।
এর আক্ষরিক অর্থ- ‘ঘরে শাশুড়ি, ননদ, শালীকে মেরে ও মাকে মেরে কাহ্ন কাপালিক হল।’ কিন্তু যোগের দিক থেকে এখানে সাসু অর্থ শ্বাস, ননন্দ অর্থ বিষয়ানন্দদানকারী ইন্দ্রিয়াদি, সালী অর্থ নিঃশেষ, মাঅ অর্থ মায়া, আর মারি অর্থ নিঃস্বভাবীকৃত করে। তাই কথাটির অর্থ দাঁড়ায়- ‘শ্বাস-নিরুদ্ধ করে বিষয়ানন্দের আকর ইন্দ্রিয়াদিকে নিঃশেষিত করে এবং মায়া চেতনাকে নিঃস্বভাবীকৃত করে কাহ্ন কাপালিক হয়েছেন।’
তথ্যসূত্রঃ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস- মাহবুবুল আলম এবং ইন্টারনেট।



পুরো লেখাটাই লিংকে চলে এসেছে। এ থেকে রেহাই পাবার পথটা কেউ বাতলে দেবনকি? যে দিবেন তাঁর জন্য অগ্রিম এক কাপ
আপনি আবার কোন ব্লগ পরিচালক??

আপনি আবার শুরু থেকে নীচের প্রসিডিউর ফলো করে আসতে পারেন,
আশা করি কাজ হবে
১) লিঙ্কে url adress copy করে ok করবেন। আপনার পুরো লেখার ঠিক উপরে কার্সর আগেই রাখতে হবে। কার্সরের জায়গায় কোডের মত লেখা আসবে।
তারপর আপনার আগের লেখার শিরোনাম পেস্ট করে লিখলে
পুরো লেখাটি লিঙ্ক হয়ে আসবে না। প্রয়োজনে প্রিভিউ দেখে নিন। মাত্র দু’দিন আগে শ্রদ্ধেয় মুরুব্বীর কাছ থেকে শিখেছি।
দেখুন চেস্তা করে।
ধন্যবাদ হাফিজ ভাই। দেখছি পারি কিনা।
এইখানে কি পড়াশুনা হচ্ছে নাকি?
হয়। চুপ করি বসি মনোযোগ দ্যান।
আরে, আমি থাকলে তো হক্কলতের পড়াশুনার ডিসটাব অইবো। তাই আমি যাইগা। আন্নেরা মনদিয়া লেখাপড়া করেন। আমি পড়ে আইস্যা পড়া ধরুম নে।
দুঃখিত আসল কোডটি মন্তব্যে আসছে না।
আপনি কাউকে ফোন করে জেনে নিন
অটোমেটিক ঠিক হয়ে গেছে।
( মনে হচ্ছে টেকু ভাই ঠিক করি দিছেন।)
তথ্য বহুম পোস্ট । চালিয়ে যাও।
সাথে থাক………..
ধন্যবাদ ভাইজান। ভালো থাকুন সেই কামনা।
বেশ নয় শুধু। চমৎকার একটি অনবদ্য পোস্ট।
ধন্যবাদ জনাব প্রধান।

জনাব প্রধান
ধন্যবাদ জামান ভাই। শুভকামনা জানবেন।
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
এই রেফারেন্স শেষ কথাই না!
ধন্যবাদ মিঞা ভাই।
বিসিএস দিতাছেন নাকি ??
বিসিএস দিতে হলে যে এগুলো পড়তে হয় তাই জানি না। আপনার কাছ থেকে জানতে পেরে খুশী হলাম। হয়তো ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। ধন্যবাদ।
প্রিয় তে রাখলাম
অনেক প্রয়োজনীয় পোষ্ট
ধন্যবাদ স্যার
ধন্যবাদ স্যার। আমারে জনাব বলিয়া সম্বোধন না করিলেও চলিবে।

কি, পড়াশুনা হয়েছে? রেডি হন, এখন পড়া ধরুম।
চোক্ষের মোটা ফ্রেমের চশমাটা আগে নাকের ডগায় ঝুলায়া ন্যান।
এই মিঞা তো বেশি কথা কয়। আপনারে বেশি কোয়েচন ধরা হবে।
বলেন:
ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের রচনাকাল ধরেছেন ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে। অন্যদিকে ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ৯৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে চর্যাপদের রচনাকাল মনে করেন। আসলে কোনটা ঠিক?
স্যার শহীদুল্লাহর লগে আমার আলগা খাতির আছে। তাই ওনারটাই ছঠিক বলে ধরে নেয়া যায়।
ব্যর্থ পাবলিক ভাই হাসেন ক্যান??
ধন্যবাদ, বাংলাভাষার প্রাচীন ইতিহাসটা শেষ করেছেন বলে।
ধন্যবাদ শামান ভাই।
ভালো থাকুন সবসময়।
থ্যাংকু মেহেদী ভাই।
চমৎকার

চলতে থাকুক
থ্যাংকু।
চর্যাপদ বাংলার আদি সাহিত্য বলা হলেও আমার কিন্তু তা মনে হয় না। যদিও সবাই তা মনে করে। চর্যাপদের ভাষা আর প্রমিত বাংলার দিকে লক্ষ্য করে দেখুন। উত্তরটা চলে আসে। তবে হ্যাঁ চর্যাপদের সাথে তখনকার বাংলার মিল ছিল খুব এমন হতে পারে, বিশেষ করে কোন অঞ্চলের আঞ্চলিক বাংলার।
ব্লগের আর্কাইভের জন্য নিঃসন্দেহে চমৎকার সংগ্রহ হবে এই সিরিজ
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করার জন্য ধন্যবাদ।
শুভ কামনা সব সময়।
ধন্যবাদ স্যার। চেষ্টা করব পুরোটা দেবার।