রাস্তায় পা রাখতে বাড়িওয়ালা আবদুল কাদেরের সঙ্গে দেখা। ভদ্রলোক মর্নিং-ওয়াক শেষে ফিরছেন। রহমান একবার ভাবলেন, বাথরুম সমস্যার কথা বলবেন কি না। বয়স্ক লোক…সকালেই তার কাছে এমন একটি অভিযোগ করা ঠিক হবে না। সন্ধ্যেয় বলবেন। তিনি সালাম দেয়ার জন্য হাত ওঠালেন। আবদুল কাদের তার আগেই সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, -
‘অফিসে চললেন নাকি? এখন তো সরকার অনেক সুবিধা করে দিয়েছে। সপ্তাহে দুদিন ছুটি। আমাদের সময় কাজের এত চাপ যে ফ্যামিলিতে একটু সময় দিতে পারতাম না।’
‘এমনি কি দুদিন অফ করেছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় হলো মূল কথা।’
‘অজুহাত তুলতে আমরা খুব ওস্তাদ রহমান সাহেব। কর্মবিমুখ জাতির কাজে ফাঁকি দেয়াটাই উদ্দেশ্য।’
‘কথাটা ফেলনা নয় বড়ভাই। কিন্তু কাজ তো কাজ; ফাঁকি দেয়ার বুদ্ধি নেই। চলি শ্লামালেকুম।’
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম।’
রহমান কমপ্লেইন দিতে পারলেন না। এটির জন্যও একটু মুখ ঝামটা দেয়ার অভ্যাস থাকতে হয়। তিনি তো আজও রিকশাওয়ালাকে আপনি সন্বোধন করেন। অথচ য়ুনিভার্সিটিতে পড়ার সময় আকতার খুব অনায়াসে একটু গোবেচারা ধরনের টিচারকেও তুই তোকারি করত। জীবনে মাঝে মধ্যে রুড হতে হয়। তিনি কিছু হতে পারলেন না। পারলেন না কিছু করতে। এখন যেমন একটু দৌড় দিলে রাস্তা অনায়াসে পার হওয়া যায়। অথচ কষ্ট করে ওভারব্রীজ হয়ে ওপারে যান। নিজেকে সান্ত্বনা দেন তিনি ডিসিপ্লিনড মানুষ।
আজ আকতার তার ঘাড়ে আবার সওয়ার হয়েছে। কেন যে নিজেকে বারবার অন্যকে দিয়ে তুলনা করেন যার কোনো মানে নেই। তিনি তো এক অনন্য মানুষ, সত্যবাদী-স্পষ্টভাষী এবং বিবেকবান। কলেজে তার যে দু একজন বন্ধু তারা এ কথা বলত। সে-সময় তার ভেতর বৃষ্টির রিমঝিম আর মনিকার দুচোখ কাব্যের ফুলঝুরি ফুটিয়ে তোলে। তিনি জানালার ধারে বসে আকাশ দেখতে দেখতে কত না প্রেমের উপন্যাস গড়ে তুলেছেন। হায় কত মধুর দিন ছিল সেসব! গভীর মায়াময়। তার বুকে দমকা হাওয়ার মতো এক বিষণ্নতা ঢেউ খেলে যায়। তিনি সামনের বড় বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে থ মেরে যান। বিজ্ঞাপনে অদ্ভুত সুন্দর এক কিশোরীর মুখ। তিনি মুহূর্তখানেক মনিকার দৃষ্টি পুনআবিষ্কারের চেষ্টা করলেন। তারপর ‘যাচ্ছে-তাই ভাবনা’ বলে নিজেকে গাল দিলেন। সেটি বুকের ভেতর কোনো অজানা অট্টহাসির মাঝে মিলিয়ে যায়।
অফিসে আগে এসেছেন। লিফট এক সপ্তাহ ধরে খারাব। সিঁড়ি ভেঙে চারতলা উঠতে উঠতে তলপেটে চাপ বাড়ে। এসে যথারীতি বাথরুম যান। ব্লাডার শূন্য করে একটু রিফ্রেস হন। আজ লখিন্দর রয়েছে। দুটি প্যানে হার্পিক ছড়িয়ে মেঝে ঝাড়ু দিচ্ছে। তাকে দেখে লম্বা করে হাত তুলে সালাম জানায়। তারপর পচাৎ করে প্যানের উপর পানের পিক ফেলে। রহমান কিছু বললেন না। একটু অস্বস্তি নিয়ে অফিস রুমে ফিরে এলেন। থাই জানালার অর্ধেক অংশ দিয়ে আকাশে কয়েকটি কাকের আনাগোনা দেখা গেল। ইট-পাথরের শহরে কাক দেখা দেবে না তো কি ময়না দেখা দেবে? তিনি নিজে নিজেই স্বগতোক্তি করেন। সে-সময় কানের মধ্যে বেজে উঠল, ময়না গো কার কারণে তুমি একেলা। একদা এ গানটি গুনগুন করে নিজেকে শোনাতেন। তখন পাশের বাড়ির আলিয়া গান শিখছিল। যাত্রায় বাজে এমন এক পুরনো হারমোনিয়ামে প্যাঁ-পোঁ শব্দ উঠত। সে সুরের তালে তালে চলত সংগীত সাধনা। কোনোদিন ভোরবেলায়, কোনোদিন বিকেলে। অনেকদিন তার নাঁকি সুরে ‘আমি যার নুপূরের ছন্দ…বেনুকার ফুল, কে সে সুন্দর কে কে এ এ এ…’ শুনে তার ঘুম ভেঙে গেছে অথবা বিরক্তি বেড়েছে। পরে এদিক ওদিক থেকে শোনে, মহিলা রংপুর রেডিওতে অডিশন দেবে। তখন প্রায় বিকেলে কলেজের ক জন সহপাঠি তার বাড়িতে আসতো। পড়া আর সিলেবাসের সঙ্গে সঙ্গে ক্যারামবোর্ড আর নানান বিষয়ে চলত আড্ডা। একদিন তাদের কানেও পৌঁছুল সংগীত সাধনার সুর। ফয়জুল শুনে বলে, -
‘রহমান তোর বাড়ির পাশে কে এই শিল্পী? একবারে আশা ভোসলে!’
‘একটু বোস দেখিয়ে দেব।’
আর কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যি আলিয়া মাঠে বের হয়ে আসে। যথারীতি তার হাতে ধরা একটি লালমুখো বানর। এটি নিয়েও কথা আছে। মানুষের শখ থাকে পাখি, বেড়াল কিংবা কুকুর পোষার; কেউ বানর পোষে এমন দেখে নি। শুনেছে, ওর বান্ধবীর বাবা নাকি সুন্দরবন থেকে নিয়ে এসেছে। রহমান ভাবছিলেন, ফয়জুলের জন্য বিষয়টি দ্বিতীয় চমক হবে। কিন্তু তাকে উল্টো চমকে দিয়ে সে মন্তব্য করে, -
‘আরে এ যে ব্লাক ডায়মন্ড। তোর বাসার পাশে এমন একটা মাল পড়ে আছে আর তুই ঘরে বসে নীহাররঞ্জন শরৎচন্দ পড়ছিস, শালা গাধা একটা।’
‘ব্যাটা আস্তে বল্…খালার বয়সী মহিলা, একটু সম্মান করতে শেখ্।’
‘আরে রাখ তোর খালা! কে খালা…অতো খালা খালা করে দিন চলে না বুঝলি। জীবনটা হলো বলপয়েন্ট কলমের মতো, একবার শেষ হলে আর রিফিল বা রিচার্জ হবে না। তুই না পারিস আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দে। কেমন লাট্টু ঘোর ঘোরাই দেখ। বীরেনকে দেখ, কি রে বীরেন, রহমান তোর ছাতরায়াসমিনের কথা জানে?’
‘ছাতরায়াসমিন!’
‘আরে সিতারা ইয়াসমিন…আমাদের বীরেনের গার্ল ফ্রেন্ড, না কি রে পাঙ্কু?’
‘ম্যালা ফ্যাচ্ ফ্যাচ করিস না তো!’
‘দেখলি কেমন রেগে যাচ্ছে, শালা একাই খাচ্ছে।’
‘খাচ্ছে মানে?’
‘বীরেন শোন কথা, রহমানটা এক্কেবারে চাঁদু গাধা।’
রহমানের স্মৃতিচারণ থেমে গেল। লখিন্দর চলে যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বেশ ফুর্তিতে গান ধরেছে, দেখা হায় পহেলিবার, সাজন কি আঁখো মে পেয়ার…টন টনা টন…টন, দেখা হায়…। রহমানের জীবনে কোনো পহেলিবার নেই। কোনোকিছুই ঠিক সময়ে হয় নি। দিন কয়েক আগে দু নম্বরি করেছেন-পহেলিবার। কামিয়েছেন হাজার দশেক। সে ক্লায়েন্টের কাজ হয়ে গেছে। মনে স্বস্তি আর ফুর্তি আসার কথা। আসছে না। তিনি বুঝলেন, সবকিছু টাকায় কেনা যায় না। তখন একটি কাক জানালার সামনে নিচ দিয়ে উড়ে যেতে যেতে কর্কশ ডেকে উঠল, কাঁরেক্ট!
(ক্রমশ)
আগের পর্ব: স্খলনের মানচিত্র ২



কাকের ভাষা আমি বুঝি না তবে মনে হয় কারেক্ট না বলে গো এহেড বলেছে কি না একটু জিজ্ঞেস করে দেখলে হত!
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। এই গল্পটি আর দিতে চাচ্ছি না। দুঃখিত। ভালো থাকবেন।
যা এক বার শুরু হয়েছে তা শেষ করার নামইতো সফলতা!
ভাল মন্দের বিচার পরে। চালিয়ে যান ভাই।
আপনার কথা ঠিক। তবে সফলতা বলে কোনো ভাবনা আমার মাথায় নেই। কথা বলতে চাই…অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই, এই হলো লেখার উদ্দেশ্য। পরের পর্ব দিয়ে দিলাম। মনে হয়, কাউকে মাঝ রাস্তায় এনে বলা যায় না, এখন নামেন, বাস যাবে না। আপনার মন্তব্যে সাহস পেলাম সত্যটুকু বলার। অশেষ ধন্যবাদ।
কিন্তু টাকা ছাড়া কিছুই কেনা যায় না। কোন এক কাক কোন একদিন এ কথা নিশ্চয়ই শুনিয়েছিল!
গল্প তার নিজের তালে এগুচ্ছে। তবে ব্লগ পোস্ট হিসেবে গতি একটু কম।
‘মাল’ বহুল ব্যবহারে মলিন হয়ে গেছে। অন্য কোন শব্দ দিলে শুনতে (পড়তে) ভাল লাগবে। দু’চারটে টাইপো আছে, যা আপনার পোস্টে সাধারণতঃ থাকে না, তাই চোখে লাগে।
গল্পটি শুরু করেছিলাম মার্চ ২০১১ এ, শেষ করলাম আগস্ট ২০১২। মাঝখানে অন্য কাজ করলাম। বিশেষ করে সাপ্তাহিক বা ওইধরনের পত্রিকার জন্য লেখা। এ জাতীয় গল্প লিখি না। লক্ষ্য করেছেন বোধহয়, আমি জীবনঘেষা পরাজয়গুলো লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আজকালকার লেখাগুলোতে একটু বেফাঁস কথাবার্তা। গল্পের তৃতীয় পর্বে এসে মনে হলো, ব্লগে এটি ঠিক হচ্ছে না। প্রায় ৬৮০০ শব্দের বড়গল্প। এটিকে আর দিতে চাইছি না, এজন্য দুঃখিত। অন্য লেখা দেয়ার ইচ্ছে আছে। বিডিনিউজ২৪ এর ব্লগে কিছু লিখছি। সালাম রইল হুদা ভাই।
শেষ পর্যন্ত পড়ার ইচ্ছা ছিল। আপনার উপরে জোর খাটাবো অতটা শক্তি কী আমার আছে?
ভাল থাকুন।
‘মাল’ শব্দের পরিবর্তে ‘জিনিস’ দিতে পারি। পরের পর্বও দিলাম। আপনি সিনিয়র আমাকে আপন ভাবতে পারলেন না
আপন লোকেরা তো দাবি করতে পারে। ভালো থাকুন হুদা ভাই। আপনার মূল্যায়ন প্রত্যাশা করি।
পরের পর্ব পড়ে এলাম। খুব, খুব খুশী হয়েছি, থেমে গেলে বেশ কষ্ট পেতাম।
‘জিনিস’ দেওয়া যায়!
‘আপন’ ভাবি না তা ভাবছেন কেন? তবু প্রত্যাশা করতে পারি শুধু, দাবী করার মত অতটা শক্তি আমি যোগাড় করতে পারি না। আমার অক্ষমতা বলতে পারেন।
শুভ কামনা।
জিনিস বা চীজ এই শব্দটি বর্তমানে বেশ চালু। পুরো গল্প পড়তে পারবেন। আমি কিন্তু শব্দনীড়কে একটি ফ্যামিলির মতো মনে করি। ভালো থাকুন।
ট্যাগ ২১+ দেখে পড়লাম
এই ট্যাগের কারণে কেউ পড়ছে না বোধহয়। পরিবর্তন করে দিলাম। বড়দের গল্প। শুভেচ্ছা রইল।
হায় কত মধুর দিন ছিল সেসব! গভীর মায়াময়। তার বুকে দমকা হাওয়ার মতো এক বিষণ্নতা ঢেউ খেলে যায়। খুব ভাল চলুক,,,,,,,,,স্মৃতির দহন,,,,,,,,
স্মৃতি সতত সুন্দর এবং দহনের কারণ। আপনার কথা ঠিক।