সকালবেলা অফিসে যাওয়ার সময় মায়ের পাঠানো পোষ্টকার্ড টি ভাজ করে মানিব্যগে রাখল রবিন। গতকাল ডাকে এসেছে মায়ের পাঠানো পোষ্ট কার্ড। মায়ের জবানীতে ছোট বোন নাসরিনের হাতের লেখা মাত্র ৩ টি লাইন। তাতে লেখাঃ বাবা রবিন, কেমন আছিস? এই মাসে পারলে কিছু টাকা পাঠাস।
লাইন তিনটা পড়েই আবার বুকের ভিতর কষ্টটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো রবিনের। বাবা মারা যাওয়ার পর গত তিন বছর ধরে ঢাকায় আছে রবিন। এইচ এস সি পাস করে ঢাকায় আসার পর নিজের চেষ্টায় একটা ছোট চাকরি যোগাড় করা, বড় হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থেকে অনার্স ভর্তি হওয়া, সবই হয়েছে আস্তে আস্তে। কম বেতনের চাকরি, তবু নিজের চাহিদা থেকে অনেক কিছুই বাদ দিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতি মাসেই রবিন চেষ্টা করে মার জন্য কিছু টাকা পাঠাতে। গ্রামের বাড়ীতে অন্তত ভাত ডালের ব্যবস্থার কথা চিন্তা করতে হয় না বলে রবিনের মা রবিনকে তেমন চাপ দেন না টাকা পাঠানোর জন্য। তবে যে মাসে কিছু বাড়তি খরচ থাকে সেই মাসে শুধু একটা পোষ্ট কার্ড পাঠিয়ে দেন। তেমনি একটা পোষ্ট কার্ড রবিনের ঠিকানায় ডাক পিয়ন দিয়ে গেছে গতকাল।
আজ মাসের ২০ তারিখ, বেতন পেতে আরও ১০ দিন বাকি। অফিসে বসে রবিন মানিব্যাগ খুলে দেখে মাত্র ৬০০ টাকা আছে। পরিক্ষার ফিস দিয়েছে মাত্র পরশু দিন, তাই নিজের পকেট ও খালি। কি করা যায় ভাবতে ভাবতে দেরাজ থেকে একটা পোষ্ট কার্ড নিয়ে তাতে লিখলঃ মা, তুমি ভালো আছো তো? এই মাসে আমার পরিক্ষার ফিস জমা দিলাম, বেতন পেতে আরও কয়েকদিন বাকি। একটু কষ্ট করে চালিয়ে নাও মা, বেতন পেলেই আমি ১০০০ টাকা পাঠিয়ে দিবো। এই পোষ্ট কার্ডটিও ঠিক আগের পোষ্ট কার্ডের পাশেই ভাজ করে রখে দিলো, দুপুরে পোষ্ট করে দিবে বলে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও মতিঝিল থেকে হেঁটে জি পি ওর দিকে যাচ্ছে রবিন। পোষ্ট কার্ডটি পোষ্ট করতে, নিজের জীবনের সংরামের কথা ভাবতে ভাবতে আনমনে যখনই স্টেডিয়াম মার্কেটের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন একজন লোকের সাথে ধাক্কা খেলো রবিন। আনমনে ছিল বলে নিজের ভুল মনে করে ক্ষমা চেয়ে, নিজের পথে আবার চলা শুরু করলো সে। কপালে ঘাম আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে জি পি ও তে প্রবেশ করেই পেছনের পকেটে হাত দিতেই দুলে উঠলো রবিন…।। নেই মানিব্যগ টা নেই, দ্রুতই বুঝতে পারল এটা সেই লোকটার কাজ, যার সাথে ধাক্কা লেগেছিল। হতাশা নিয়েই জি পি ওর ভিতরে রাখা চেয়ারে বসে পড়লো রবিন। চিন্তা জুড়ে থাকলো … কি করে পার করবে বাকি মাসটা।
অফিসের এক স্যার এর কাছ থেকে ৫০০ টাকা ধার নিয়ে সেদিনের মতো বাসায় ফিরল রবিন। নিয়তি আর ঐ পকেটমার এর উপর রাগ ক্ষোভ থেকে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লো সে।
ঠিক ৩ দিন পর রবিনের অফিসের ঠিকানায় আরেকটি পোষ্ট কার্ড আসলো তার মায়ের পাঠানো। কার্ডটি হাতে নিয়েই নিজের অজান্তে দু চোখ বেয়ে নেমে এলো অশ্রু। তার কাছে তো টাকা নেই, সে কিভাবে মা কে পাঠাবে টাকা। কি লেখা আছে না দেখেই পকেটে রেখে দিলো পোষ্ট কার্ড। রাতে বাসায় এসে মন কে আর মানাতে পারল না রবিন, মা কি লিখেছে তা দেখার জন্য। পোষ্ট কার্ড খুলে যা লেখা দেখল তাতে রবিন হতো বিহ্বল হয়ে বসে রইলো অনেক ক্ষণ… মনে চলল ঝড় একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজার জন্য। রবিন আশা করেছিলো টাকার জন্য মা হয়তো আবার লিখেছেন, কিন্তু রবিনের ধারনা ভুল প্রমানিত করে সেই পোষ্ট কার্ডে লেখা, “বাবা, তোমার পাঠানো ১০০০ টাকা পেয়েছি। ৫০০ টাকা দিয়েছি নাসরিনের স্কুলের পরিক্ষা ফি।“
আমি তো টাকা পাঠাইনি, মা তাহলে কিভাবে টাকা পেল? মনের ভিতর অনেক বার এই প্রশ্ন আসলেও কোন উত্তর খুঁজে পায়নি রবিন। কিন্তু উত্তর টা জানার খুব দরকার ছিল বলেই হয়তো রবিনের ঠিকানায় প্রায় ১৫ দিন পরে আসলো আরেকটি পোষ্ট কার্ড। তাতে লেখা, “রবিন ভাই, আমি এক হতভাগ্য পকেটমার। পেটের খুধার তাগিদে লোকের পকেট থেকে চুরি করি। ভাগ্যক্রমে সেদিন আপনার পকেট মেরেছিলাম, আপনার মানিব্যগে দুটি পোষ্ট কার্ড দেখলাম। আপনার মায়ের ঠিকানায় আমি আপনার ৬০০ টাকার সাথে আরও ৪০০ টাকা মিলিয়ে ১০০০ টাকা পাঠিয়েছি। আপনার কাছে অনুরোধ মা কে জানাবেন না এই কথা, সে জানুক তার ছেলে পাঠিয়েছে। মা তো মা… তার চাইতে আপন তো আর কেউ নেই। পারলে ক্ষমা করবেন“



কি বলব, চোখে পানি চলে আসলো গল্পটা পড়তে গিয়ে। তবে শেষটা এতো চমৎকার করেছেন কৃতজ্ঞতা রইল।
পকেটমার হোক আর যে ই হোক তারও ভিতরে যে মনুষত্য আছে এই গল্পটা তা প্রমাণ করে। চারিদিকে যখন শুধু হতাশা আর ক্ষোভ তখন এই রকম উদারতার গল্প মনটা ভরিয়ে দেয়।
এর পরে দেখা হলে এতো সুন্দর গল্পের জন্য একটা আইসক্রিম খাইয়ে দিব কথা দিলাম।
ধন্যবাদ আপা
গল্পটা লিখে আমি নিজেই সঙ্কায় ছিলাম, আপনাদের ভালো লাগবে কিনা ভেবে।
পুরুস্কার পাবো ভাবিনি
খুব বেশ লাগলো ভাইজান
ধন্যবাদ বড় ভাই

আসলে মানুষ এই জন্যই হয়তো মানুষ
মন বলে যেই স্বত্তাটি মানুষের আছে সেই স্বত্তাটিই মানুষকে মানুষ বানায়।
পেটের দায়ে কত্তো জনে কত্তো কিছু করে তার কোন ইয়াত্তা নাই
কিন্তু আমাদের সমাজে এখন অনেক রাগব বোয়ালরা কোটি মানুষের পেটে লাথি মেরে নিজের ভুড়ি বাড়াচ্ছে -অথচ তার পেটে ক্ষুধাই নাই
যত্ত ক্ষুধা সব মনে।
ছোট্ট গল্প কিন্তু এত বেশি নাড়া দিয়ে গেলো যে আমি বাকহারা
আমাদের মন এখনো মোড়ে যায়নি। এখনো আমরা মায়ের জন্য কাঁদি।
ধন্যবাদ স্যার, ভালো থাকবেন
সময় নিয়ে পড়িব ভ্রাতা
স্বাগতম
মোবাইলের যুগে পোষ্টকার্ডের কপাল পুড়েছে। এখন আর কেহ পোষ্টকার্ড বা ইনভেলপে চিঠি লিখে না।
চোরকে খারাপ বললেও এমন অনেক চোর আছে তাড়া ভালো চোর।
খুব ভালো লাগল।
ছোট্ট একটা গল্প, তার মাঝে লুকিয়ে আছে বৃহৎ একটা প্রাণ! এমন যে হয় না তা তো নয়! আর তখনই বুঝা যায় যে, আমরা এখনও ফুরিয়ে যাইনি, একেবারে নিঃশেষ হয়নি মনুষ্যত্ব।
গল্পের থিম, আর গল্প বলার সহজ-সরল কৌশল, দুটোই অতি চমৎকার।
আমরা এখনও ফুরিয়ে যাইনি, একেবারে নিঃশেষ হয়নি মনুষ্যত্ব।
এটাই আসলে এই গল্পে বোঝাতে চেয়েছি। ধন্যবাদ ভাইয়া
গল্প টি পড়ে মনটা ভাল হয়ে গেল। ধন্যবাদ এমন মন ভাল করে দেওয়া গল্পের জন্য।
এই গল্প পরে মনে হল, এখনো আমাদের মাঝে মনুষ্যত্ব আছে।
খুব ভাল লেগেছে ভাই। এমন আরও লিখুন।

ধন্যবাদ আপু
একটু চেষ্টা করলাম
অনেক বেশি টাচি
ধন্যবাদ রাজিন
কেমন আছো?
মানুষ মানে মানুষ তা আরো একবার গল্প পড়ে প্রমান পেলাম
অসম্বব সুন্দর হয়েছে আপনার লেখা
ধন্যবাদ খেয়ালী মন
সুন্দর গল্প।
সেই সঙ্গে মনে পড়ে গেল বালক বেলায় দেখা একটি বাংলা সিনেমার কথা। পকেট মার এক যুবকের কাছ থেকে সদ্য চুরি করা একটি ওয়ালেটে এমন একটি চিঠি পেয়ে খুবই অনুতপ্ত হয়। পরে ঠিকানা ধরে সেইগ্রামে যায়। পরিচয় দেয় যুবকের বন্ধু বলে। অভিনেতা মনে হয় রাজ্জাক ছিলেন।
ধন্যবাদ স্যার