বিশ্ব শ্রমিক দিবস: নিহত শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য

১ লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (মে দিবস নামেও পরিচিত) মে মাসের প্রথম দিনটিকে পৃথিবীর অনেক দেশে শ্রমিক দিবস হিসাবে পালিত হয়। বেশকিছু দেশে মে দিবসকে লেবার ডে হিসাবে পালন করা হয়। এদিনটি সরকারীভাবে ছুটির দিন। ১৮ শতকে (১৮ শতক মানে ১৭০০- ১৭৯৯ সাল) পৃথিবীতে একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটে। যান্ত্রিক সভ্যতার এতো উন্নতি হলো, মানে বিজ্ঞানীরা এমন এমন সব যন্ত্র আর কল নির্মাণ করলেন যে, প্রকৃতি অনেকটাই মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে এলো। এর আগে পর্যন্ত মানুষ ছিল মূলত কৃষিজীবী। এইবার মানুষ হলো যন্ত্রনির্ভর। মানুষ কৃষিসভ্যতা থেকে প্রবেশ করলো যন্ত্রসভ্যতায়। মানবসভ্যতার এই পরিবর্তনটিই শিল্পবিপ্লব নামে পরিচিত। বিশাল বিশাল সব কল- কারখানা তৈরি হতে থাকলো। আর সেসব কল- কারখানায় কাজ করে হাজারো মানুষ। আর এইখানেই লাগলো যতো গোল।

কল- কারখানার কাজ তো বোঝোই, যেমন পরিশ্রমের, তেমনি কষ্টের। গরমের মধ্যেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়। ওদিকে মালিক পক্ষও লাভের মুখ দেখলো। এবার তারা লাভ যতো বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা করতে লাগলো। এখন শ্রমিকরা যতো বেশি সময় কাজ করবে, উৎপাদনও ততো বেশি হবে। কাজে কাজেই লাভও ততো বেশি হবে। সুতরাং তারা শ্রমিকদের দিয়ে ইচ্ছেমতো খাটিয়ে নিতে লাগলো। দিনে ১৮ ঘণ্টা- ২০ ঘণ্টা কাজ করাতে লাগলো। কী অত্যাচার, চিন্তা করো! তাও না হয় মানা যেতো, যদি তুলনামূলকভাবে পারিশ্রমিকও ভাল দিতো, তাই না? কিন্তু শ্রমিকদেরকে তারা পারিশ্রমিকও দিতো খুবই অল্প। ফলে যা হবার তাই হলো, শ্রমিকরা প্রতিবাদ করতে শুরু করলো। আর মালিকরাও বিদ্রোহী শ্রমিকদের উপর শুরু করলো অত্যাচার। এই শ্রমিক বিদ্রোহে সেই সময় অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন অসংখ্য শ্রমিক। তাদের আন্দোলনের মূল দাবি ছিলো- একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা কাজ করবে, এর বেশি নয়। মালিকরা শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করায় ১৮৮৬ সালের ১ মে মার্কিন মুলুকে অর্থাৎ আমেরিকায় ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলো এই শ্রমজীবি মানুষেরা। আর এই ধর্মঘটের প্রধান কেন্দ্র ছিলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহর। ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সাল- আমেরিকার শিল্পোন্নয়নের সময়। কিন্তু এরমধ্যেও একবার মন্দা দেখা দিয়েছিল, ১৮৮৪-৮৫ সালের দিকে। তখন অনেক কল কারখানাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। ফলে বহু শ্রমিকও বেকার হয়ে পড়ে। এর পরেই শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবিতে আরো বেশি সোচ্চার হয়ে উঠলো। কিন্তু এই দাবি মানলে যে মালিকদের ক্ষতি-ই হয়! তারা এই দাবি মানলো না। কী আর করা, শ্রমিকরা ১৮৮৬ সালের ১ মে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট শুরু করলো।

১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রমদিনের দাবীতে আন্দোলন রত শ্রমিকের ওপর গুলি চালানো হলে ১১ জন শহীদ হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় এইদিন পালিত হয় না। এ ছাড়া এইদিনে আরও কিছু ঘটনা রয়েছে যা আঞ্চলিক ভাবে হয়তো পালিত হয়। পূর্বে শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রম করতে হত, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আর সপ্তাহে ৬ দিন। বিপরীতে মজুরী মিলত নগণ্য, শ্রমিকরা খুবই মানবেতর জীবনযাপন করত, ক্ষেত্রবিশেষে তা দাসবৃত্তির পর্যায়ে পড়ত। ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেঁধে দেয় ১৮৮৬ সালের ১লা মে। কিন্তু কারখানা মালিকগণ এ দাবী মেনে নিল না। ৪ঠা মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট নামক এক বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। তারা ১৮৭২ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন। আগস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয়। পুলিশবাহিনী তৎক্ষনাত শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুইস লিং নামে একজন একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্যএকজনের পনের বছরের কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের পূর্বে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, “আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে”। ২৬শে জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন, এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনোই প্রকাশ পায়নি। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের “দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করার” দাবী অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবী আদায়ের দিন হিসেবে, পৃথিবীব্যাপী আজও তা পালিত হয়।
এই দূর্বার আন্দোলনের সামনে অবশেষে নতজানু হতে হল কল- কারখানার মালিকদের। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের কিছু মৌলিক দাবি ও অধিকার স্বীকৃত হতে শুরু করলো। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের একটি সম্মেলন। তাতে শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময় ৮ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ১ দিন ছুটির বিধি রেখে তৈরি হল প্রথম শ্রম আইন।
১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয় ১ মে শিকাগোর আন্দোলনে প্রাণ দেয়া শ্রমিকদের স্মরণে মে দিবস পালন করার। পরের বছরেই, ১৮৯০ সালের ১ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে প্রথম মে দিবস পালিত হয়। অবশ্য পরের বছর থেকেই আমেরিকা আর কানাডা সেপ্টেম্বরে শ্রমিক দিবস পালন করতে শুরু করে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমাদের দেশে ১ মে সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হয়ে আসছে- বিশ্ব শ্রমিক দিবস হিসেবে। কিন্তু শুধু সরকারি ছুটি হিসেবে পালন করলেই কী শ্রমিক দিবস পালন করা হয়ে যায়? শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দিতে হবে, তাদেরকে দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না, ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বেতনের চেয়ে বেশি হিসেব করে ওভারটাইম মজুরি দিতে হবে- এসবই যদি না করা হয়, তাহলে শ্রমিক দিবস পালন করে লাভটাই বা কী ?
সারা বিশ্বব্যাপি শ্রমিকের শ্রমের মর্যাদার জন্যে যে শ্লোগান, িশকাগো থেকে শুরু হয়েছিল এর আন্দোলন। উন্নত বিশ্বে শ্রমের মর্যাদা কিছুটা হলেও যেন আছে। তবে বিশ্ব মন্দায় অর্থনীতি ভঙ্গুরের সুযোগে আস্তে আস্তে যেন মলিন হতে চলেছে উন্নত বিশ্বের শ্রমের মর্যাদা। আর অনুন্নত দেশগুলোতে যেন আজো পায়নি তাদের শ্রমের অধিকার। তারমধ্যে বলা যায় বাংলাদেশে শ্রমের মর্যাদার অবমূল্যায়ন সর্বনিম্নে। সার্বক্ষনিক যেন শ্রমিকের সংঘর্ষ চোেখ পড়ার মতো। এর মূলে রয়েছে তারা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। এজন্য দায়ী আমাদের দেশের সরকারগুলো। আমাদের দেশের শ্রমিকদের বেতন ভাতা খুবই নগন্য। যা দিয়ে একটি শ্রমিক তার জীবন চালাতে অনেক কাঠ খোরাতে হয়। অপরদিকে দেখা যায় এই শ্রমিকদের দ্বারা কস্টার্জিত করিয়ে মালিকগন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক, বিলাশবহুল তাদের জীবন ব্যবস্হা। তাদেরই কর্মরতদ খেটে খাওয়া মানুষগুলো নুন আনতে পানতা ফুরায় অবস্হা, করূণ তাদের জীবন ইতিহাস। আজকে উন্নত বিশ্বের একজন সাধারণ শ্রমিকেরও গাড়ি কিংবা বাড়ি আছে। কিন্ত আমাদের দেশের মানুষের জীবনের যেন কোন মূল্য নেই, এরা অন্য দেশেও শ্রমিক হিসাবে মূল্যায়ন খুব কমই পেয়ে থাকেন। যা অন্য দেশের শ্রমিকদের চেয়ে মূল্যায়ন খুবই কম। সেখানেও আমাদের দেশের সরকার এবং যারা আদম ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের কারণে। আশা করবো এই মে দিবসকে ঘিরে আমাদের দেশের শ্রমের মূল্যায়ন এবং তাদের যথাযথ অধিকার ফিরে পাবে।
অনেক কষ্টে অর্জিত আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস আজ সারা বিশ্বে আনান্দ উৎসবের মধ্যে পালিত হলেও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা আজও হয়নি। অধিক সময় কাজ, অস্বাস্থ্যকর পরিবশে, শ্রমিক- মালিক তিক্ত সম্পর্ক, শ্রম চুরি করে বিত্ত বৈভব তৈরির প্রচেষ্টা অব্যহত। অবশ্য এটা পুঁজিবাদের স্বভাব। এ ধরণের অর্থব্যবস্থার মধ্যে থেকে এর থেকে ভাল কিছু আশা করা যায় না। শ্রম উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, শ্রমিক তার শ্রম বিক্রি করলেও নিজেকে বিক্রি করে না, সে একজন মানুষ। তার ভালভাবে বাঁচার অধিকার আছে। আর এ শ্রমিকরাই তো সভ্যতার বুনিয়াদ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু পুঁজিবাদ এ শ্রমিককে শুধুমাত্র একটি পণ্যে রুপান্তর করে এর মানবাধিকার লুণ্ঠন করেছে। পুঁজিবাদের অমোঘ পরিণতি হিসেবে শ্রমিক ও মালিকের অর্থসম্পদের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হবে এবং যা বাড়তেই থাকবে, এ ব্যবধান যদি কমিয়ে আনা যায় তবেই শ্রম দিবস উদযাপন স্বার্থক হবে।


তথ্যসূত্রঃ
বিডিনিউজটোয়েন্টিফোরডটক, উইকিপিডিয়া,

VN:R_U [1.9.7_1111]
রেটিং করুন:
Rating: 0.0/5 (0 votes cast)
VN:R_U [1.9.7_1111]
Rating: 0 (from 0 votes)

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের, লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর। শব্দনীড় ব্লগ কোন লেখা ও মন্তব্যের অনুমোদন বা অননুমোদন করে না।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

৬ টি মন্তব্য (লেখকের ৩টি) | ৩ জন মন্তব্যকারী

  1. ডা. দাউদ : ০১-০৫-২০১২ | ১:০৭ |

    শ্রমিকেরা আজো পদদলিত সমাজের রাঘব বোয়ালদের কাছে
    আজো তারা নির্যাতিত
    ধন্যবাদ প্রিয় পোষ্ট টি শেয়ার করে সচেতনতার প্রকাশ করলেন।

  2. খোকন চন্দ্র দে : ০১-০৫-২০১২ | ৪:২৫ |

    শেয়ার করলাম।
    ভালো লাগার ভালোবাসায় সতত, ধন্যবাদ। “শুভ সর্বসং ব্লগিং”

    আন্তর্জাতিক ‘মে দিবস’ উপলক্ষ্যে অভিনন্দন ও ফুলেল শুভেচ্ছা।

  3. মাহবুব আলী : ০১-০৫-২০১২ | ১৫:০৯ |

    আপনার এই লেখাটি সকালে লগ অন না করেই পড়েছি। চমৎকার লিখেছেন। আমার কাজে আসবে। অভিনন্দন। তারপর কেমন আছেন?