আমার বসন্তকাল

গত ১জুন আমার শ্বাশুড়ী আম্মার মৃত্যুবাষির্কি ছিল, সেই কারণে ২৯তারিখ রাতে আমরা রংপুরে যাই। ৩০তারিখে আপাদের বাসায় সবাই বসে গল্প করছিলাম খেয়াল করলাম আমাদের সামিয়া আর ইলমা দুজন চুপি চুপি কি যেনো করছে। সবার সাথে গল্পে মশগুল থাকায় ব্যাপারটা তেমন খেয়ালে নিলাম না। ১তারিখে ব্যস্ততার কারণে আর কোথাও যাওয়া হয়নি, ২তারিখ রাতে বাস, তাই সকালেই আপাদের বাসায় চলে গেলাম, আবার বসলাম আড্ডায়। রাকা আমাকে একটা সাদা কাগজ এনে দিয়ে বলল, পড়ে দেখো কি লেখা। পড়লাম, দেখি ওতে দুজনের কথোপোকথন লেখা, মানে সামিয়া আর ইলাম ৩০ তারিখে দুজন দুজনকে চিঠি লিখছিল। চিঠিটা পড়ে দেখি অনেক বানান ভুল। কিছু বললাম না দুজনকে। দুজন তখন মশগুল ডোরেমন দেখায়। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো দুজনকে ডোরেমন দেখানো বন্ধ করার এবং বানান যে ভুল তা বুঝানোর।
দুজনকে বললাম, তোমাদের দুজনকে ৩০মিনিট সময় দিলাম, দুজন দুটো কাগজে যা মন চায় লিখ, গল্প, ছড়া, কবিতা বা চিঠি যা ইচ্ছা লিখ। দুজনতে দুটো সাদা কাগজ আর কলম দেয়া হল। ইলমা মহা খুশী কারণ সে লিখতে ভালবাসে, কিন্তু সামিয়া একটুকু খুশী হলো না , মনে হয় জড়তা কাটাতে পারেনি তাই কিছু লিখলো না।
ইলমা বলল চাচী আমি কবিতা লিখবো। আমি বললাম , লিখ। সে লেখা শুরু করল, তবে শর্ত দিল সেই কবিতা আমি ছাড়া আর কেউ পড়বে না। শর্তে রাজি হলাম। ইলমা প্রায় ১৫মিনিট সময় নিয়ে একটা কবিতা লিখে আমাকে দিল, আমি পড়লাম, মনে মনে খুব খুশী হলাম, কারণ লেখাটা ওর বয়সি বাচ্চার তুলনায় অনেক ম্যাচিউরড। জামানকে পড়তে দিলাম তবে ইলমার অনুমতি নিয়ে। জামান পড়ে হেসে দিয়ে বলল ওর বয়সিরা এই ভাবেই বোধ হয় লিখে। ইলমা পরে বলল সে এই লেখাটা ইংরেজীতে লিখতে চায়। আমি বললাম ঠিক আছে লিখ। সে বাংলায় সময় নিলেও ইংরেজীতে লিখতে সময় নিল না। খুব তাড়াতাড়ি লিখলো।

এবার ইলমার পরিচয় দেই। ইলমা বয়স ৮বছর, বাবা মা দুজনই ডাক্তার, ওর বাবা আমার দেবর মানে জামানের খালাতো ভাই। আগে তারা ঢাকায় থাকতো এখন বাবা মায়ের পোষ্টিং রংপর হওয়ায় সেখানে থাকছে। ইলমা ঢাকার মেরিকুরি স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়তো, পড়াশুনায় ভাল বলে তাকে প্রমোশন দিয়ে এবার থ্রির ক্লাসে নেয়া হয়েছে। খুব কথা বলে, গায়ে এইটুকু মাংশ নেই, মানে খুব শুকনা, খাওয়া দাওয়ার চেয়ে পড়তে ছবি আকতে গান গাইতে তার পছন্দ বেশী। ইলমাকে আমি ছোট বেলা থেকে দেখে এসেছি তাই আমরা ওর বেশ প্রিয় চাচা আর চাচী। ইলমা কে ওর দাদু মানে আমাদের খালু যখন বয়স তিন বছর তখন ধন ধান্য পুষ্পে ভরা এই গানটা শিখিয়ে ছিল, যা শুনে আমরা তাজ্জব। সঠিক উচ্চারনে সে ওই বয়সে গানটা আমাদের শুনাতো।
ইলমা এখন তার খালাতো ভাইদের দেখা দেখি লেখা লেখি করে, তার গল্প ও লেখা আছে যা শুধু বাবা মা পড়তে পারে(মানে এটাই শর্ত), আর এতো চমৎকার ছবি আকে প্রতিটি ছবির সাথে থাকে চমৎকার ক্যাপশন। গায়ে মাংশ না থাকলে কি হবে সারাদিন বক বক করতেই থাকে আর দুষ্টামিতো আছেই। এতো এনার্জি ও পায় কোথায় ওই জানে।

আমি ইলমাকে বললাম তোমার এই কবিতা আমি ব্লগে দিলাম, ও লজ্জা পেয়ে বলল চাচী তাহলে বানান ঠিক করে দিও তা না হলে সবাই আমাকে ভাব্বে আমি বানান পারি না। আমি হেসে বললাম থাক না যা লিখেছ তাই দেই। আমি ওর লেখা কবিতা এখানে দিলাম, মজার একটা কথা বলি কবিতার শিরোনাম ছিল আমার বসন্তকাল, কিন্তু ও ভুলে বসন্তের জায়গায় হেমন্ত লিখেছে, নিজের ভুল নিজে ধরেছে আমি আর সংশোধন করিনি, হোক না ভুল একটা বাচ্চার লেখা এতো কি আর সঠিক হবার আছে।

সামিয়া আর ইলমার চিঠির কথোপোকথন
Photobucket

ইলমার লেখা
Photobucket

Photobucket

Photobucket

ইলমা আর সামিয়া(বামে সামিয়া ডানে ইলমা)
Photobucket

ইলমার কবিতা(হুবহু ওর লেখা তুলে দিলাম)

বসন্তকাল
ইলমা ফাতিমা আলম

এই আমার হেমন্তকাল
তোমায় আমি দেখি
এবং তুমি আমায় দেখ।

ঠিক একিভাবে যেভাবে
আমি তোমায় দেখি
সব ফুল তোমায় দেখে
এবং আমি তোমায় দেখি
এবং তুমি আমায় দেখ।

ইলমার ইংরেজিতে লেখা এই কবিতা:

My Spring season
Elma Fatima Alam

oh my dear little spring
I love you very much
and you love me too
Many flowers bloom and look
at you just like me.

আসলে এই পোষ্টটা দেয়ার উদ্দেশ্য এই কারণে যে শিশুকাল থেকে যদি চর্চা রাখে সে ভাল লেখিকা হতে পারে। ইলমার ইচ্ছা সে গায়িকা হবে । এখন দেখা যাক সে আসলে কি হয়। কারণ আগে বলত বাবা মায়ের মতো ডাক্তার হবে, কিন্ত এখন সে হতে চায় গায়িকা।
সবাই ইলমা , সামিয়া আর সব বাচ্চাদের জন্য দোয়া করবেন যেনো পৃথিবীর কোন নোংড়ামি ওদের বাচ্চা মনটাকে নষ্ট করতে না পারে।

VN:R_U [1.9.7_1111]
রেটিং করুন:
Rating: 0.0/5 (0 votes cast)
VN:R_U [1.9.7_1111]
Rating: +1 (from 1 vote)

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের, লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর। শব্দনীড় ব্লগ কোন লেখা ও মন্তব্যের অনুমোদন বা অননুমোদন করে না।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

১৩ টি মন্তব্য (লেখকের ০টি) | ১২ জন মন্তব্যকারী

  1. আ,শ,ম,এরশাদ : ১৮-০৬-২০১২ | ১৫:৫৬ |

    ওদের কথা শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল।
    আমার একটা কৌতুহল আছে এই প্রজন্মের বেড়ে ওঠার প্রতি। ওরা কি ভাবে কি করে এই সব যার কিছু নমুনা এখানে পেলাম।
    ধন্যবাদ বড় আপু জি।

    কুচ দোয়া মেরে লিয়ে করিয়েন দিদি।

  2. ডা. দাউদ : ১৮-০৬-২০১২ | ১৬:০০ |

    ঠিক একিভাবে যেভাবে
    আমি তোমায় দেখি
    সব ফুল তোমায় দেখে
    এবং আমি তোমায় দেখি
    এবং তুমি আমায় দেখ।

    মারাত্মক তো!!!!!!!!!!
    এই মেয়ে নির্ঘাত কবি হয়ে নাম কামাবে
    oh my dear little spring
    I love you very much
    and you love me too
    Many flowers bloom and look
    at you just like me.
    সত্যি সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার
    মাই গড
    আল্লাহ তাদের দীর্ঘ জিবন দান করুন
    সু শিক্ষা আর মেধাবিকাশে কৃপা দান করুন।

    অনেক অনেক ধন্যবাদ আপা এত্ত মমতা দিয়ে বিষয়টা শেয়ার করেছেন যে
    মনে মনে বেশ পুলকিত হলাম পড়তে গিয়ে
    শুভ কামনা সকলের জন্য

  3. চারুমান্নান : ১৮-০৬-২০১২ | ১৬:৩৮ |

    বেশ না ডুবিয়ে,,,,,,,,,,,,,,,,,
    আড্ডা হল তাই না!!!!!!!!!!!!!! Yes Yes Rose Clover Clover Clover Clover

  4. চারুমান্নান : ১৮-০৬-২০১২ | ১৬:৩৯ |

    বেশ নাক ডুবিয়ে,,,,,,,,,,,,,,,,,
    আড্ডা হল তাই না!!!!!!!!!!!!!! Yes Yes Rose Clover Clover Clover Clover

  5. কৃতদাসের নির্বাণ : ১৮-০৬-২০১২ | ১৯:০১ |

    creative! ছোট্ট দুটি লেখকের জন্যে শুভকামনা……। Rose

  6. সাহাদাত উদরাজী : ১৮-০৬-২০১২ | ১৯:৪৮ |

    শুভেচ্ছা ওদের জন্য। ছোট থেকেই চেষ্টা হলে ভাল। তবে লেখালেখি একটা কঠিন কাজ!

  7. দীপক সাহা : ১৮-০৬-২০১২ | ২২:৪৯ |

    দুজনের জন্যই অনেক অনেক প্রীতি, শুভেচ্ছা আর শুভকামনা। প্রার্থনা করছি যেন ওরা দুজনেই অনেক বড় হয়।

  8. নাজমুল হুদা : ১৯-০৬-২০১২ | ৮:৪০ |

    ওদের রঙিন শৈশব নানান রঙে রঞ্জিত হোক। লেখার আকাঙ্ক্ষা টিকে থাক সারা জীবন। নিশ্চয়ই ওরা সফল হবে।
    শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

  9. জামান আরশাদ : ২০-০৬-২০১২ | ১১:০৪ |

    দুই পাকা বুড়ির জন্য রইল শুভ কামনা।

    এভাবেই সুস্থ, সুন্দর চর্চ্চার মাধ্যমে বেড়ে উঠুক আমাদের আগামী প্রজন্ম।

  10. মুহাম্মদ সাঈদ আরমান : ২০-০৬-২০১২ | ১২:১৩ |

    পোস্টটি অনেক ভাল লাগল। সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠুক ওরা
    আল্লাহর কাছে এই দোয়া করি ।
    শুভকামনা সতত

  11. আফরোজা হক : ২০-০৬-২০১২ | ২২:১২ |

    সত্যিকারের ভালো থাকুক পৃথিবীর সকল শিশু।

  12. ঘাস ফড়িং : ২৬-০৬-২০১২ | ২০:৫৫ |

    আপনার এই সহজ সরল জীবনের গল্প, ছোটদের নিয়ে ভাবনা আর ওদের প্রকাশটাকে এভাবে তুলে ধরার আইডিয়াটা অনেক অনেক ভালো লাগল।

  13. শিবলী শাহেদ : ২৮-০৬-২০১২ | ১৭:০৮ |

    ভালো লাগল পড়ে । দুজনেই প্রকৃত পরিবেশ ও পরিচর্যা পেলে বাংলা সাহিত্যে অনেক দূর যেতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস ।