নায়িকার নাগরিকত্ব কান্ড!

কালেরকন্ঠে প্রকাশিত ‘অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব পেলেন শাবনূর’ শিরোনামের একটি রিপোর্টে চোখ আটকালো। রিপোর্টের এক জায়গায় লেখা হয়েছে, ‘গতকালই দুপুর ২ টা ২০ মিনিটে অস্ট্রেলিয়া সরকারের পক্ষ থেকে শাবনুরকে সে দেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। শাবনুর নিজেই উপস্থিত হয়ে নাগরিকত্বের সনদপত্র গ্রহণ করেছেন’। নানা কারনে রিপোর্টটি পড়ে থতমত খেতে হয়েছে, অথবা হাসি থামাতে পারিনি! কারন ‘গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫ টা ১০ মিনিটে তিনি একটি পু্ত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, নবজাতক ও মা সুস্থ আছেন’, বা ‘শনিবার প্রত্যুষে তিনি হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন(ইন্না লিল্লাহে— রাজেউন)’ জাতীয় অনেক রিপোর্ট জীবনে পড়েছি অথবা লিখেছি। কিন্তু এ ধরনের রিপোর্ট আগে পড়েছি কিনা জানিনা। লিখিতো নাই’ই। শাবনূর বাংলাদেশের সেলিব্রটি চিত্র নায়িকা। ঢাকার ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিতে এক সময় তার অনেক দাপট-প্রতাপ ছিল। সেলিব্রেটিরা নাকি হাঁচি মারলেও তা নিয়ে রিপোর্ট হয়, তা অনেক লোকজন পড়ে। শাবনুরের এই রিপোর্টটিও হয়তো অনেক লোকজন পড়েছেন। রিপোর্টের তথ্যগুলো শাবনূর হয়তো রিপোর্টারকে ঠিকমতো বলেননি অথবা রিপোর্টার ঠিকমতো জানার চেষ্টা করেননি। অথচ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব সহ সব খুঁটিনাটি তথ্যই অনলাইনে দেয়া আছে। কীভাবে আবেদন করতে হয়, কি কি যোগ্যতা থাকলে, শর্ত পূরণ করলে এদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া যায়, কিভাবে নাগরিকত্বের শপথ অনুষ্ঠান হয়, এসবের সমুদয় তথ্য দেয়া আছে সেখানে। (www.immi.gov.au) অথবা (www.studyinaustralia.gov.au) । তাই বিষয়গুলোর একটু খোলাসা হওয়া দরকার। নতুবা দেশের মানুষের কাছে বিশেষ করে শাবনূর ভক্ত তরুণ সমাজের কাছে ভুল একটা বার্তা যাবে।

দৈনিক কালেরকন্ঠের এ রিপোর্টটি(http://www.kalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=Cook&pub_no=894&cat_id=1&menu_id=54&news_type_id=1&news_id=256400&archiev=yes&arch_date=26-05-2012) পড়লে মনে হবে সেদিন মনে হয় বাংলাদেশের সেলিব্রটি নায়িকা বলে একা শাবনুরকেই বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে! এ তথ্যটাই ঠিক বা বাস্তব না। ওই অনুষ্ঠানটিকে বলা হয় সিটিজেনশীপ সিরিমনি অথবা নাগরিকত্বের শপথ অনুষ্ঠান। কোন একটি সিটি কাউন্সিল এলাকার (সিডনিতে এমন ১৪ টি সিটি কাউন্সিল আছে) একটি হল রূমের ভিতর ওই শপথ অনুষ্ঠানে একসঙ্গে শতাধিক ব্যক্তির শপথ হয়। সবার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবেরাও অনুষ্ঠানে থাকেন। এলাকার এমপি অথবা মেয়র সেখানে সরকারের পক্ষে সেখানে নাগরিকত্ব প্রার্থীদের সেদেশের আনুগত্যের বিষয়ে শপথ করান। সবাই দাঁড়িয়ে একসঙ্গে হাতে দেয়া শপথপত্রটি তার তথা চীফ গেষ্টের সঙ্গে পড়েন। এরপর একজন একজন করে ডেকে তার হাতে তুলে দেন নাগরিকত্বের সনদপত্র। এর পর হয় চা-চক্র। এই শপথ আর সনদপত্র পাবার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন। এদেশের ভোটার হন। সে কারনে ওই সময় খুশি খুশি লোকজন ওই সনদপত্র হাতে চীফ গেষ্টের সঙ্গে ছবিও তোলেন। কিন্তু ‘দুপুর ২ টা ২০ মিনিটে অস্ট্রেলিয়া সরকারের পক্ষ থেকে শাবনূরকে সে দেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে’, রিপোর্টের এ লাইনটাই বেখাপ্পা বেশি! বাংলাদেশে দুপুর ২ টা ২০ মিনিট মানে সিডনিতে সন্ধ্যা ৬ টা ২০ মিনিট। এদেশে এ ধরনের অনুষ্ঠান সাধারনত ছুটির দিনে অথবা উইকডেজে হলে সন্ধ্যায় অফিস সময়ের পরে হয়। সময়ের এ তথ্যটি পড়ে মনে হবে শাবনূর কী শুধু তখন ঘড়ির দিকে তাকিয়েছিলেন! এটা কী নিশাত মজুমদার অথবা ওয়াসফিয়া নাজরীনের মতো কোন এভারেষ্ট বিজয়ের ঘটনা নাকি? সেখানে গান হলো, অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সংগীত-বক্তৃতা হলো, লাইনে হেঁটে একজনের পিছনে আরেকজন এগিয়ে গিয়ে সনদপত্র নিলো। ছবি তুললো, শাবনুর কী পুরো সময়টা এভাবে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিলেন? আমরা যারা দেশের গরিব মানুষেরা ফ্রি চিকিৎসা সহ নানান স্যোশাল সিক্যুরিটির কারনে এদেশে এসে থাকি-নাগরিকত্ব নেই, তারাওতো এক ধরনের অপরাধবোধ অথবা লজ্জায় এসব বুক ফুলিয়ে মুখ ফুটে বলিনা। শাবনূরতো দেশের অন্যতম সেলিব্রেটি ছিলেন। দেশ তাকে অনেক দিয়েছে। এসব বড়াই করে মিডিয়ায় বলতে তার একটু লজ্জাও করেনি?

রিপোর্টটাতে আছে গত দু’তিন বছর ধরেই শাবনূরের নাগরিকত্বের বিষয় নিয়ে গুঞ্জন চলে আসছে! এসবেরও সোজা উত্তরও অনলাইনে আছে। গত শুক্রবার (২৫ মে) শাবনূরের অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকত্ব হয়ে থাকলে এদেশে তার পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি বা স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে ভিসা স্টেটাস হয়েছে ২০০৭ সালে আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি বাঙ্গালিদের মধ্যে ৯৮% বা এরও বেশি পড়াশুনা শেষে এদেশে অভিবাসন পেয়েছেন। অবশিষ্টরা অভিবাসন-নাগরিকত্ব পেয়েছেন স্কিলড-বিজনেস মাইগ্রেশন অথবা শরণার্থী হিসাবে আশ্রয়প্রাপ্ত হিসাবে। কোন একজন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক বা স্থায়ী বাসিন্দাকে বিয়ে করে বা তার পার্টনার হিসাবেও অভিবাসনের আবেদন করা যায়। শাবনূর কোন ক্যাটাগরিতে অভিবাসন পেয়েছেন, তা তিনিই সঠিক বলতে পারবেন। বিজনেস ক্যাটাগরিতে যে না তা একটি তথ্যে স্পষ্ট। কারন সিডনির ব্যাংকস টাউন এমইএস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে তাকে ইংরেজি পড়ানো-শেখানো হয়েছে। যারা এদেশে অভিবাসন নিয়ে আসেন বা এখানে এসে অভিবাসন নেন, তাদেরকে এ প্রতিষ্ঠানটিতে ফ্রি ইংরেজি পড়ানো-শেখানো হয়। শাবনুরের সেখানে ইংরেজি শেখার তথ্যটি আমরা দেদে দিদাক নামের সেখানে তার এক সহপাঠিনীর কাছে পেয়েছি। শাবনূর অভিনেত্রী জানার পর ইউটিউবে তার অনেক ভিডিও দেখেছেন ইন্দোনেশিয়ান মেয়ে দিদাক। শাবনূর স্কিলড মাইগ্রেশনে এসে থাকলে দেশ থেকেই আইএলটিএস স্কোর নিয়ে আসার কথা। এখানে এসে তার ইংরেজি শিখতে হতোনা। আর অভিবাসন ছাড়া এদেশের ইংরেজি শেখা যে কী ব্যয়বহুল, তা ওয়াকিফহালরা জানেন। আর এদেশে ব্যবসা-বানিজ্যে বিশেষ স্বচ্ছলরা এমইএস’এ ফ্রি ইংরেজি শিখতে যান না। অস্ট্রেলিয়ায় শাবনূরের ভাইবোন কিন্তু এদেশে পড়াশুনা করতে এসে অভিবাসন নিয়েছেন।

২০০৭ সালের ৩১ জুলাই অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসন নিয়ে নতুন একটি বিধান চালু হয়। ওই তারিখের পর অভিবাসন প্রাপ্তদের চার বছর পর নাগরিকত্ব দেয়া হচ্ছে। আবার আরেকটি শর্ত হচ্ছে এই চার বছরের কোন একটি বছর কোন রকম বিরতি ছাড়াই এদেশে থাকতে হবে। সম্ভবত ২০০৭ সালে অভিবাসন তথা তার স্থায়ী বাসিন্দার ভিসা স্ট্যাটাসটি হবার পর থেকেই দেশে শাবনূরের নাগিকত্বের গুজবের ডালপালা মেলেছে-বেড়েছে। অভিবাসনের পর নাগরিকত্ব শর্তের চার বছর পূরণ করা নিয়েই সেগুলো আরও লম্বা হয়েছে। এরমাঝে শাবনূরকে আরও যে কাজটি করতে হয়েছে তা রিপোর্টে উল্লেখ নেই। তাহলো গত বছরের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়া সরকারকে ২৬০ ডলার ফি পরিশোধ করে অনলাইনের পরীক্ষায় তাকে সিটিজেনশীপ টেস্টে পাশ করতে হয়েছে। এরপর আবার শুক্রবারের সিরিমনিয়াল অনুষ্ঠানের জন্যে অপেক্ষা করতে হয়েছে লম্বা সময়। কারন অস্ট্রেলিয়ায় আজ নজিরবিহীন অভিবাসন জটও দেখা দিয়েছে! যে সব ছাত্র প্রায় দু’বছর আগে টি আর বা পি আর’ এর আবেদন করেছেন, তারা এখনও কোন রেজাল্ট পাননি। এদেশে আবার কোথাও ফোনে বা তদবিরে বা অন্য কোন উপায়ে নিজের নাম আগেপরে করে নেবার কোন সুযোগ নেই। সবকিছু হয় ধারাবাহিক, নিয়ম মাফিক। কালেরকন্ঠের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘শাবনুর নিজে উপস্থিত হয়ে নাগরিকত্বের সনদপত্র গ্রহণ করেন’!

নিজে উপস্থিত না থেকে এটি পাবার সুযোগ নেই। কারন এরসঙ্গে নাগরিকত্বের শপথ জড়িত। শপথ ছাড়া কাউকে নাগরিকত্বের সনদ দেয়া হয়না। তার বিয়ে কিন্তু কবুল বলে আরেকজন, এর কোন সুযোগ এখানে নেই। বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে শাবনুর যখন গদগদই হবেন, এ বিষয়গুলোও তার সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারকে স্পষ্ট করে দেয়া দরকার ছিল। অথবা এসব স্পষ্ট জেনে লিখার দরকার ছিল সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারের। তাহলে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দৈনিকটির মাধ্যমে এভাবে একট ভুল বার্তা যেত না। কারন আগেই বলেছি, শাবনুর দেশের অন্যতম সেলিব্রেটি। দেশ তাকে যেমন অনেক দিয়েছে, দেশের ফিল্ম ইন্ডাষ্ট্রিতে তার অবদানও কম নয়। তাই অনুরোধ করবো এ রকম ভুল বার্তা যাতে একজন সেলিব্রেটির মাধ্যমে না যায়। অস্ট্রেলিয়ায় যারা আসবেন, তারা সবকিছু জেনে আসলে, আইন-নিয়মের বেঁধে দেয়া পথে হাঁটলে এই মানবিক মানুষের দেশে তাদের কোথাও কোন বিপদে বা সমস্যায় পড়ার কোন সুযোগ নেই।

VN:R_U [1.9.7_1111]
রেটিং করুন:
Rating: 4.0/5 (1 vote cast)
VN:R_U [1.9.7_1111]
Rating: +1 (from 1 vote)
নায়িকার নাগরিকত্ব কান্ড!, 4.0 out of 5 based on 1 rating

এই পোস্টের বিষয়বস্তু ও বক্তব্য একান্তই পোস্ট লেখকের নিজের, লেখার যে কোন নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব লেখকের। অনুরূপভাবে যে কোন মন্তব্যের নৈতিক ও আইনগত দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্তব্যকারীর। শব্দনীড় ব্লগ কোন লেখা ও মন্তব্যের অনুমোদন বা অননুমোদন করে না।
▽ এই পোস্টের ব্যাপারে আপনার কোন আপত্তি আছে?

৫ টি মন্তব্য (লেখকের ০টি) | ৫ জন মন্তব্যকারী

  1. শাহ আকরাম রিয়াদ : ২৭-০৫-২০১২ | ৯:৩০ |

    খাড়ান আমিও হেই দ্যাশের নাগরিকেত্বর লাইগ্যা এপ্লাই করুম!!

  2. বিষণ্ণময়ী : ২৭-০৫-২০১২ | ১৫:৩৩ |

    আমি যতোটুকু জানি শাবনূর অষ্ট্রেলিয়া থেকেই এপ্লাই করেছিলেন এবং নাগরিকত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা বেশী ছিল। তাই শাবনূর সব প্রসেসিং সর্ম্পূণ করে দেশে এসে আবার ছবি করেছেন।
    আসলে সত্যটা শুধু মাত্র সেলিব্রেটিরাই বলতে পারেন। শাবনূরের একটা ব্যাখ্যা অবশ্যই পেতে পারেন তার ভক্তরা। আমি নিজেও তার ভক্ক। Grin

  3. অরুদ্ধ সকাল : ২৭-০৫-২০১২ | ১৬:০০ |

    আচ্ছা ভ্রাতা আফ্রিকার নাগিরকত্ব পাবার কোন অনলাইন লিঙক দিতে পারেন কি

  4. অপদেবতা : ২৭-০৫-২০১২ | ১৮:০৩ |

    খ্যাক খ্যাক (বিরল প্রজাতির হাসি , বিশেষ সময়ে সময়ে বের হয়,থামানো যায় না , ক্যাটগরি : ভয়ংকর)